উলিপুরে চিকিৎসার অভাবে ধুকে-ধুকে মরছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাতেন

কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভার জোনাইডাঙ্গা গ্রামের মৃত-হাজী কছিম উদ্দিনের পুত্র হত-দরিদ্র অসহায় অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাতেন। গত ০১ মে ২০১৯ইং তারিখে শরীরের উচ্চচাপ জনিত রোগে স্টোক করে মস্তিস্কে রক্ত জমাট, হাত-পা অবস ও বাকরুদ্ধ হয়ে পরে আছেন তিনি।

গত ৮ মাস ধরে প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ও পরে রংপুরস্থ একতা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিয়ে জীবনে বেঁচে গেলেও তিনি অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসা ও চিকিৎসা খরচ যোগাতে না পারায় রোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না।

শুধু মাথা গোজার ঠাই টুকু ছাড়া সহায় সম্বল যা ছিল,  স্বামীর চিকিৎসা করতে মুক্তিযোদ্ধা পত্নী সাহের বানু এখন অন্যের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তুলে কোন রকমে ৪ সদস্যের পরিবার চালাচ্ছেন। এক দিকে স্বামীর পঙ্গুত্ব জীবন, অন্যদিকে ঘরে বিবাহ উপযুক্ত কলেজ পড়ুয়া দুই কন্যার ভরন-পোষণ ও পড়া-লেখার খরচ জোগাতে দুঃচিন্তা গ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। আগে স্বামী-স্ত্রী দু’জনই অন্যের চাতালে  শ্রমদিয়ে উপার্জন করতো। এখন একাকেই সব করতে হয়। তাই তাঁর সংসারে এখন বাসা বেঁধেছে অভাব ও অনটন। কোন কোন দিন অনাহারে-অর্ধাহারে কাটতে হচ্ছে তাদের।এমন দূর্বিসহ জীবন-যাপনের কথা বলতে  বলতে সাহের বানু কেঁদে ফেলেন। এমতাবস্থায় সাহায্য চেয়ে সমাজের বিত্তবান মানুষসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

আজ ৭৫ বছর বয়সের ভারে ও অসুস্থ্তায় নূয়ে পড়লেও একাত্তরের উত্তাল দিনে ২৩ বছরের যুবক ছিলেন আব্দুল বাতেন। সেই সময় উপজেলার মালতিবাড়ীতে বাবা-মায়ের সাথে বাস করেছিলেন। বাবার নিজ গ্রাম হাতিয়া ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদে বিলীণ হওয়ার পর তাদের জীবন ছিলো খুবই অভাবের। তাই দারিদ্রতা তখন থেকেই ধাওয়া করেছিলো তাকে। পাক বাহিনীর বর্বরতা যখন বেড়ে গিয়েছিলো চারিদিকে খুন-হত্যা, ধর্ষন, লুটপাট, অগ্নি সংযোগ চলছিলো। বর্বরচিত পাক-হানাদার বাহিনীর নিপীড়ন-নির্যাতনে হাজারো মানুষের আহাজারি এই যুবকের হৃদয় বিঘড়ে দেয়। ১৯৭১ সালে পাক সেনার অত্যাচারে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলেন না তিনি। দেশ ও দেশের মাটি-মানুষের প্রতি ভালবাসা তাকে ঘরে বসে থাকতে দেয়নি।

দেশের মাটি ও মানুষের কথা চিন্তা করে বাপ-মা, ভাই-বোন, স্বজনদের ভালবাসাকে ছিন্ন করে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে বেড়িয়ে পড়ে এই যুবক। সাহসের সাথে এলাকায় যুবকদের সংঘটিত করে ভারতে যুদ্ধের প্রশিক্ষন নেন। সহ-যোদ্ধাদের সাথে দাপটের সাথে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে নেন তিনি। মাথায় গুলির চিহ্ন। সম্মুখ যুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে গুলির আঘাত খেয়ে সেদিনও প্রাণে বেঁচে গেছেন আব্দুল বাতেন।

পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২-৩ বছরের মধ্যে ধরনীবাড়ী ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামে আনোয়ারা বেগমকে বিয়ে করেন তিনি এবং শ্বশুর বাড়ীতে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্ত্রী আনোয়ারা সন্তান প্রসব জনিত কারণে মৃত্যু বরন করলে কিছুদিন সেখানে থেকার পর বাস্তুহারা হয়ে নিঃসঙ্গ ৮ বছর মানুষের বাড়ি-বাড়ি রাত্রি যাপন করেন। পরে তিনি উলিপুর পৌরসভাস্থ জোনাইডাঙ্গা গ্রামের মৃত-শমসের আলীর কন্যা বর্তমান স্ত্রী সাহের বানুকে বিয়ে করে বৌয়ের ভাগে পাওয়া আড়াই শতক জমিতে একটি কুরো-বাড়ী গড়ে শ্বশুরালয়ে বর্তমান ২৫ বছর থেকে অবস্থান করছেন। সংসারে আয়-উপার্জন করার মত উপযুক্ত কন্যাদের চাকুরী দিতে পারেননি। তাই তাঁর সংসারে এখন বাসা বেঁধেছে অভাব-অনটন। স্বা-স্ত্রীক অন্যের চাতালে দিন মজুরী করে কোন মতে ৬ সদস্যের পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন-যাপন করে আসছিলেন।

এছাড়া ২০০৫ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতার ৩৭২ নং গেজেট ভুক্ত হয়ে ভাতা সুবিধা পাচ্ছেন। বর্তমানে তাঁদের ঘরে ৪ কন্যা সন্তান। ১ম কন্যা সাথী বেগম ও ২য় কন্যা সাধনা বেগমকে বিয়ে দেয়া ও স্বামীর অসুস্থ্যতার চিকিৎসায় গুচ্ছিত সম্বল শেষ হওয়ায়, আর কোন উপায় না থাকায় মধ্য বয়সী স্ত্রী সাহের বানু অন্যের বাসা-বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে আতিকষ্টে অপর ২ কন্যাকে মানুষ করছেন। বর্তমান ৪ সদস্যের সংসার তাঁর। বিবাহযোগ্য কন্যা জোসনা বেগমের বয়স ২১ এবং আশা মনির বয়স ১৯ বছর। কন্যাদায়গ্রস্থ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাতেনের স্ত্রী সংসার চালাতে পাড়ছেন না। ঘরে বিয়ের উপযুক্ত কন্যা অন্যদিকে তাদের লেখা-পড়া, ভরন-পোষন ও স্বামীর চিকিৎসার অর্থ যোগান দিতে অক্ষম মুক্তিযোদ্ধা পত্নীর দুঃচিন্তা যেন আষ্টে-পিষ্ঠে ধরেছে।

আব্দুল বাতেনের স্ত্রী জানান, ‘মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিকট আবেদন করেছিলাম। কিন্তু আবেদন পত্র সঠিক দপ্তরে পৌঁছাতে না পারার কারণে সাহায্য পাই নাই।’ ছোট মেয়ে আশা মনিকে কয়েকবার পুলিশের লাইনে দাড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু চাকরি হয় নাই।

এদিকে, উলিপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ফয়জার রহমান ও পৌর কমান্ডার মুক্তা খন্দকার জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাতেন খুবই সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। সে একজন আমাদের ভাতাভোগী মুক্তিযোদ্ধা। তার অসুস্থতার পর পরিবারটিতে অভাব-অনটন চলছে। এবতাবস্থায় তাঁর উপযুক্ত কন্যাকে চাকুরী ব্যাবস্থা করতে পারলে অভার কিছুটা লাঘব হতো।

আসলাম উদ্দিন আহম্মেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি