দুর্ঘটনা রোধে ট্র্যাক ও ট্রেনে ডিভাইস বসানোর সুপারিশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগ স্টেশনে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ও ঢাকাগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেনের দুর্ঘটনায় ‘বিভাগীয় কর্মকর্তা’ পর্যায়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন রেলপথ মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তূর্ণা এক্সপ্রেস সব বিপজ্জনক সঙ্কেত অমান্য করে স্টেশনে ঢোকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

ট্রেনের চালক ও সহকারী চালক প্রত্যেকটি লাল সঙ্কেত মেনে ট্রেন চালালে এবং গার্ড তার দায়িত্ব পালন করলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।

লোকোমোটিভে ও ট্র্যাকে ডিভাইস বসানো, বেশি সতর্কতার সঙ্গে সিগন্যাল পর্যবেক্ষণ, সব ট্রেনে চালক ও গার্ডদের রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মোবাইল সিম ব্যবহার ও ট্রেনে ওয়াকিটকি সব সময় সচল ও কার্যকর রাখার ব্যবস্থাসহ একগুচ্ছ সুপারিশ রয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

বিশেষ ডিভাইস বসালে বিপজ্জনক সিগন্যালের কাছাকাছি ট্রেন এলে চালক কোনো ব্যবস্থা না নিলেও ট্রেনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে যাবে।এই ডিভাইস কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রোববার রেলওয়ে মহাপরিচালক এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন রেলপথ মন্ত্রণালয় সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. মিয়া জাহান বলেন, “বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা হয়েছে সচিব মহোদয়ের কাছে।  আরও একটি কমিটির প্রতিবেদনও দুয়েকদিনের মধ্যে আসবে। সব প্রতিবেদনের বিষয়ে বিস্তারিত মন্ত্রী মহোদয় শিগগির গণমাধ্যমে ব্রিফিং করবেন।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মন্দবাগ স্টেশনে মঙ্গলবার ভোররাতে উদয়ন এক্সপ্রেস ও তূর্ণা নিশিথার সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ ১৬ যাত্রী নিহত এবং অর্ধ শতাধিক আহত হয়। এ দুর্ঘটনায় রেলের ক্যারেজ ও ওয়াগন বিভাগের ২০ লাখ ৬২ হাজার ৩৮০ টাকা, প্রকৌশল বিভাগের ২০ হাজার ৯০০ টাকা ও লোকো বিভাগের ১৭ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর মন্ত্রণালয়ের নেওয়া নানা পদক্ষেপ তুলে ধরে পরদিন জাতীয় সংসদে বিবৃতিতে তূর্ণার চালককে দায়ী করে রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, তূর্ণার লোকো মাস্টার সঙ্কেত অমান্য করায় এ দুর্ঘটনা হয়েছে।

তূর্ণা এক্সপ্রেসে কর্তব্যরত তিনজনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তারা হলেন- লোকমাস্টার তাসির উদ্দিন, সহকারী অপু দে, ওয়ার্কিং গার্ড আব্দুর রহমান। সঙ্কেত অমান্য করায় বিধি অনুযায়ী এ তিনজনকে দায়ী করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

রেলওয়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. নাসির উদ্দিনের (ডিটিও/চট্টগ্রাম) নেতৃত্বে ৪ সদস্যের দল তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, “তূর্ণা ট্রেনের চালক ও  সহকারী চালক তাদের অনুকূলে থাকা প্রত্যেকটি লাল সংকেত মেনে ট্রেন চালালে এ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। তারা তা করেনি, বিধায় এ দুর্ঘটনার জন্যে ট্রেনের এলএম (লোকোমাস্টার) ও এএলএম (সহকারী লোকোমাস্টার) দায়ী। ট্রেনে কর্মরত গার্ড যদি নিজ দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে হয়তো এ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হত।”

একগুচ্ছ সুপারিশ

১। চালক ও গার্ডরা বেশি সতর্কতার সঙ্গে সিগন্যাল পর্যবেক্ষণ করবেন।

২। লোকোমোটিভে ও ট্র্যাকে ডিভাইস বসানোর প্রয়োজন, যাতে বিপজ্জনক সিগন্যালের কাছাকাছি ট্রেন এলে চালক কোনো ব্যবস্থা না নিলে ট্রেনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে যাবে।

৩। এলএম (লোকোমাস্টার), এএলএম (এসিসটেন্ট লোকোমাস্টার) ও  গার্ডদের জন্য নিয়মিত রিফ্রেশার কোর্সের আয়োজন করতে হবে।

৪। ট্রেনের গার্ড ও এলএমকে দেওয়া ওয়াকিটকি সব সময় সচল ও কার্যকর রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

৫। সব ট্রেনে চালক ও গার্ডদের রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মোবাইল সিম ব্যবহার করতে হবে। যাতে কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ সহজেই রাখা সম্ভব হয়।

৬। সংকেত আদান-প্রদানে সংশ্লিষ্টদের আরও যত্নবান হতে হবে।

৭। ট্রেন পরিচালনার আগে চালক ও সংশ্লিষ্টদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

৮। রাতের ট্রেনে চালক ও গার্ডদের  ক্লান্তি এড়াতে ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে আখাউড়া জংশনে তাদের পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৯। রাতের ট্রেনে বিশেষ করে কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় ক্রসিংয়ের সময় বেশি সতর্কতার  জন্যে কন্ট্রোল থেকে আগেই সংশ্লিষ্টদের অবহিত করবেন।