মাদ্রাসা ছাত্র’র কাটা মাথা পুকুর থেকে উদ্ধার, ৫ শিক্ষক আটক

চুয়াডাঙ্গায় দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত মাদরাসা ছাত্র আবির হুসাইনের মাথা অবশেষে উদ্ধার হয়েছে। হত্যাকান্ডের প্রায় ৩৬ ঘন্টা পর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় মাদরাসার পাশে মশিউর রহমানের পুকুর থেকে তার মাথা উদ্ধার করে খুলনার একটি ডুবুরী দল। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো: কলিমুল্লাহ।

বেলা ১১টায় পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সাধারণ গ্রাম বাসীকে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে, মূল রহস্য উদঘাটনের আশ্বাস দেন। এরপর পরই গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হত্যাকান্ডের পর পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা থেকে র‍্যাবের একটি ডগ স্কোয়াডের স্পেশাল দল বুধবার দিনভর অভিযান চালিয়েও নিহত মাদরাসা ছাত্রের মাথা উদ্ধারে ব্যর্থ হয়। অবশেষে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস ও খুলনার ডুবিরী দল অভিযান শুরু করে মাদরাসার পাশের একটি পুকুরে। অভিযানের একপর্যায়ে সকাল ১০টার দিকে উদ্ধার হয় আবির হুসাইনের মাথা।

এদিকে, এ হত্যাকান্ডের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে মাদরাসার ৫ শিক্ষককে। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে বলাৎকারের ঘটনা ধামাচাপা দিতে খুব কৌশলে হত্যা করা হয়েছে ওই মাদরাসা ছাত্রকে। এর ঘটনাটি ভিন্নখাতে দিতে শরীর থেকে মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করে গুম করা হয়।

তিনি আরো জানান, প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, নিহত ওই ছাত্রকে দীর্ঘদিন ধরে যৌন নির্যাতন চালানো হচ্ছিল। যৌন নির্যাতনের ঘটনাটি ধামাচাপা দিতেই পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয় তাকে। ময়না তদন্তে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ঘটনার পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল মাদ্রাসার ৫ শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। আটকদের হাতের ছাপ সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে ঢাকায়।

মাদ্রাসাটির মুহতামিম মুফতি আবু হানিফ জানান, ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে আবির হুসাইন প্রায় ১ বছর আগে এই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। তার মা কমেলা খাতুন তাকে ভর্তি করান। বর্তমানে আবির হুসাইন মাদ্রামায় দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়াশুনা করত। মুফতি আবু হানিফের মতে মঙ্গলবার এশার নামাজের একটু আগে আবির হুসাইন নিখোঁজ হয়। স্থানীয়দের সহযোগিতায় গ্রামের বিভিন্ন স্থানে অনেক খোঁজাখুজি করেও আমরা তার সন্ধান মেলাতে পারেনি। এরপর সকালে গ্রামবাসি মাদ্রাসার অদূরে একটি আমবাগানে আবিরের মাথাবিহীন লাশ পড়ে থাকতে দেখে।

আলমডাঙ্গা থানার কর্মকর্তা ইনচার্জ আসাদুজ্জামান মুন্সি জানান, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে সকাল ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান পিপিএম (বার), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কানাই লাল সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. কলিমুল্লাহসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশ নিহতের ছাত্রের লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠাতে গেলে উত্তেজিত হয়ে ওঠে গ্রামবাসি। তারা মাদ্রাসা ছাত্র আবিরের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকেন। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের এক চিকিৎসকের ময়নাতদন্তের বর্ণনা দিয়ে মো. কলিমুল্লা

সাংবাদিকদেরদের বলেন, ওই ছাত্রকে দীর্ঘদিন ধরে যৌন নির্যাতন চালানো হতো। নির্যাতনের ঘটনাটি ধামাচাপি দিতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি।

মাদ্রাসা ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গেছে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করতে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা ডা. শামীম কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রাথমিক ভাবে আমাদের কাছে সে রকমই মনে হয়েছে। বিষয়টি আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমরা ডিএনএ টেস্ট ও নিহতের শরীরের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকাতে পাঠিয়েছি।

এদিকে, বিকালে র‍্যাপিড এ্যাকশান ব্যাটালিয়ন র‍্যাবের সদর দপ্তর থেকে হেলিকপ্টার যোগে ডগস্কোয়াড নিয়ে একটি বিশেষ দল চুয়াডাঙ্গা আসেন। টিমের সদস্যরা সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ঘটনাস্থলসহ আশপাশের কয়েক কিলোমিটার অনুসন্ধান চালিয়েও নিহত মাদ্রাসা ছাত্রের মাথা উদ্ধারে ব্যর্থ হন। দলটির ইনচার্জ ছিলেন অতি: পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা মাসুদ আলম। গতকাল দৌলতপুর পারিবারিক গোরস্থানে আবিরের লাশ দাফন করা হয়।

উল্লেখ্য, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা দৌলতপুর গ্রামের দুবাই প্রবাসী মোহম্মদ আলী হোসেনের পুত্র।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবুল হোসেন মোল্ল্যা জানান, আবিরের বাবা মোহম্মদ আলী হোসেনের আগের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। ১০ বছর আগে সে কালীগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের মৃত নাজেম মন্ডলের মেয়ে গোলাপী খাতুনকে বিয়ে করে এ গ্রামেই সংসার শুরু করে। এরপর থেকে প্রায় ১০ বছর ধরে এ গ্রামটিতেই বসবাস করে আসছে। টানাটানির সংসারে থেকে অনেক কষ্ট করে বছর খানেক আগে সে সংসারের সুদিন ফেরাতে দুবাই পাড়ি দেয়।

ওই গ্রামের বাসিন্দা এমদাদ হোসেন জানান, মা-বাবা সাংসারিক শত অভাবের মধ্যদিয়েও আবিরের বাবা দুবাই গেছে সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে। আবিরের ছোট আকিদ নামেরও তাদের আরেকটি ৩ বছরের শিশু সন্তান রয়েছে। সংসারের টানাটানির মধ্যদিয়েও সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল এ দম্পতি। কিন্তু এরইমধ্যে মা বাবার বুক খালি করে দিল সন্ত্রাসীরা।

আরো উল্লেখ্য, দৌলতপুর গ্রামের তার এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে বছর খানেক আগে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের নুরানী হাফেজিয়া এতিমখানায় শিশু আবিরকে ভর্তি করে। এরপর থেকে সে এ প্রতিষ্ঠানটিতে লেখাপড়া করে আসছিল।

আবিরের প্রতিবেশি ও তার শিক্ষক তামিম বিন ইউসুফ জানান, আবিরের বাবা প্রবাসে যাওয়ার কিছুদিন আগে আবিরকে চুয়াডাঙ্গর একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করে। সেখানে হাফেজী পড়ছিল।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার কোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব হোসেন জানান, হত্যার শিকার হওয়া শিশুটির বাবা মা অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। এমন ক্ষতি অপুরণীয় ও অকল্পনীয়।

মাদ্রাসার মোহতামিম আবু হানিফ জানান, গতকাল মঙ্গলবার রাতে এশার নামাজের পর থেকে আবিরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিষয়টি মাদ্রাসা কমিটি ও পুলিশকে জানানোর পরও খোঁজ মিলছিল না। পরে সকালে মাদ্রাসার পেছনের আমবাগান থেকে আবিরের মাথাবিহীন লাশ পাওয়া যায়।

এদিকে, এ ঘটনার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে মাদ্রাসা ছেড়ে নিজ নিজ বাড়িতে যেতে শুরু করে মাদ্রাসার ছাত্ররা।

জাহিদুর রহমান তারিক, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি