ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি, সারা দেশে ৩১ মামলা, ১০৩ গ্রেফতার

শিশুদের মুণ্ডু শিকারি সন্দেহে পিটিয়ে মানুষ হত্যার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ায় তৈরি হওয়া অরাজকতা ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে পুলিশ। সাম্প্রতিক গণপিটুনিগুলোর ঘটনায় সারা দেশে মোট ৩১টি মামলা হয়েছে। জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন ১০৩ জন।

ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, “প্রতিটি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রত্যেককে গ্রেফতার করা হবে।”

পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ‘নরমুণ্ডু’ দরকার, এমন ‘কুসংস্কার’ প্রসূত গুজব থেকে জন্ম নেওয়া এই অস্থিরতায় গত দুই সপ্তাহে দেশের ১৬ জেলায় ২৬টি গণপিটুনির ঘটনায় কমপক্ষে আটজন নিহত ও ৪৪ জন আহত হয়েছেন।

পুলিশ প্রধান দাবি করেন, “গণপিটুনির ঘটনায় যে আটজন নিহত হয়েছেন, তাঁরা সবাই নিরীহ, কেউ ‘ছেলেধরা’ নন।”

একইদিন এই গণপিটুনির হিড়িক প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করতে সচিবালয়ে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদও বলেন, “এখন পর্যন্ত ‘ছেলেধরার’ একটি ঘটনাও সত্য নয়। যারা এ গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে মানুষ মারছে, সবগুলো হত্যাকাণ্ড।”

“যারা এগুলো করছে, সবাই হত্যা মামলার আসামি,” যোগ করেন আওয়ামী লীগের এই প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক।

এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও এই দিন সাংবাদিকদের বলেন, “আইন হাতে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। এটি অপরাধ-অপকর্ম।”

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, “এসব ঘটনায় আমাদের বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতাই প্রতিফলিত হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা জনগণকে বিচার বিভাগ সম্পর্কে হতাশ করেছে। এখানে খুব কম মানুষই আদালতে ন্যায্য বিচার পায়।”

“একই সঙ্গে তারা পুলিশ বাহিনীর ওপর তাদের বিশ্বাসও পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। এখানে পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় বিধায় জনগণ মনে করে তারা নিরপেক্ষতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করবে না,” বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই শিক্ষক।

অন্যদিকে আইজিপি বলেন, “যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে সরকারবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত লোকজন আছেন।”

সেতুমন্ত্রী বলেন, “এটা দেশে অস্থিতিশীল, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টির চক্রান্ত কিনা, এর সঙ্গে কারও কোনো যোগসাজশ আছে কিনা বা সরকারকে বিপদে ফেলার চক্রান্ত কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

“যারা গুজব সৃষ্টি করবে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে” বলেন তিনি।

এর আগে গত ৯ জুলাই পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে বলে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তার কোনো সত্যতা নেই। পরে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে বিভিন্ন এলাকায় গ্রেফতার ও হয় বেশ কয়েকজন।

এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) নেত্রকোনা শহরে এক যুবকের ব্যাগে ‘শিশুর মাথা’ পেয়ে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয়রা। এরপর থেকে বিভিন্ন এলাকায় ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা বাড়তে থাকে।

গণযোগাযোগ বিশ্লেষক আলী আর রাজী  বলেন, “অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও আমরা শিক্ষাদীক্ষায় যে ভীষণ পশ্চাৎপদ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলতেও যে আমাদের কিছু নেই, সেটাই এ পরিস্থিতিতে লজ্জাজনকভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”

“মানুষের মনন উন্নয়নে কোনো কাজ হয়নি। এটার খেসারতই আমরা এভাবে দিচ্ছি, আরও দিতে হবে,” বলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এই শিক্ষক।

ঢাকার বাড্ডার একটি স্কুলে নিজের মেয়েকে ভর্তির জন্য তথ্য সংগ্রহ গিয়ে গণপিটুনিতে নিহত তাসলিমা বেগম রেনুর আত্মীয় সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু  জানান, রেনুর চার বছর বয়সী মেয়ে তুবা মা বাড়ি না ফেরায় রাগ করে খাবার খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

পুলিশের সচেতনতা সপ্তাহ

গুজব প্রতিরোধে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার থেকে সচেতনতা সপ্তাহ পালন করবে জানিয়ে আইজিপি বলেন, “শুক্রবারের খুতবায় ইমাম সাহেবদের এ নিয়ে কথা বলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।”

“মূলত দুভাবে গুজব ছড়িয়েছে। কেউ না বুঝে হুজুগে, আবার কেউ পরিকল্পিতভাবে ছড়াচ্ছে, এক প্রশ্নের জবাবে বলেন তিনি।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হচ্ছে উল্লেখ করে জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, কোন ‘পোস্ট’ দিয়ে গুজবের শুরু হয়েছে, তা পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে গুজব সৃষ্টিকারীদের মধ্যে এক ব্যক্তি দুবাইয়ে থাকেন, তাঁকে শনাক্ত করা গেছে।

এ ছাড়া গুজব ছাড়ানোর অভিযোগে ৬০টি ফেসবুক আইডি, ২৫টি ইউটিউব লিংক এবং ১০টি অনলাইন পোর্টাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিরোধে ক্ষমতাসীনরা

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, “আমরা দলীয়ভাবেও নির্দেশ দিয়েছি, দলের নেতারা যেন সতর্কতামূলক সভা ও সমাবেশ করে। গুজব থেকে গণপিটুনির মতো দুঃখজনক ঘটনাগুলো যেন না ঘটতে পারে সে জন্য দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

“এমপিরাও যার যার এলাকায় গিয়ে সভা সমাবেশ করবেন। চিফ হুইপের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত নির্দেশও দেওয়া হয়েছে,” যোগ করেন দলের এই প্রভাবশালী নেতা।

“আশা করছি, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে,” বলেন ওবায়দুল কাদের।

যে কারণে গুজব ছড়িয়েছে

বিশ্লেষক আলী আর রাজী  বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমের বৃত্তের বাইরে, শিক্ষাদীক্ষা বা আধুনিক জ্ঞানমনস্কতা থেকে বহুদূরে যে বিশাল জনগোষ্ঠীর আছেন, মূলত তাঁদের মাঝেই গুজবটা ছড়িয়ে পড়েছে।”

“সরকারের কোনো ভাষ্যই তাঁরা বিশ্বাস করছেন না, সেটাকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করছেন। গুজবের ক্ষেত্রে সাধারণত এমনটাই হয়। সরকারের প্রতি তাঁদের আস্থা নেই বলেই গুজবটা এভাবে ছড়িয়েছে। এটা সমাজের জন্য ভয়ঙ্কর।”

“তাঁরা ভাবছেন সরকার যেহেতু পদ্মা সেতু করতে বদ্ধপরিকর, আমাদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে মাথা নেবেই,” এমনটাই ধারণা রাজীর।

তিনি বলেন, “এমন প্রচারের মনোবৃত্তি অনেক প্রাচীন। আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের বাইরের বিশাল জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, বড় স্থাপনা তৈরি করতে হলে ‘বড় ত্যাগ’ দরকার।

পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ ও সরকারি দলের নেওয়া উদ্যোগের ব্যাপারে রাজী মনে করেন, তারা খুবই ভুল পথে আছে। এই পদ্ধতিতে একটি গুজব হয়তো প্রতিরোধ করা যাবে। কিন্তু আবারও নতুন গুজব তৈরি হবে।