কুড়িগ্রামে সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি, বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট

গত ৫ দিন ধরে কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কে ধরলা সেতুর পুর্বপাড়ে প্লাস্টিক শিট দিয়ে তাবু বানিয়ে বসবাস করছেন সদর উপজেলার পাঁচগাছী কদমতলা গ্রামের কয়েকশ পরিবার। ঘর-বাড়ি বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। কিন্তু এই ৫ দিনে সরকারি বা বেসরকারি সাহায্যের তেমন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।

প্রায় একি রকম বসবাসের দৃশ্য চোখে পড়বে কুড়িগ্রাম জেলার ৯ উপজেলার বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে। যেখানেই উঁচু বাঁধ বা পাকা সড়ক রয়েছে সেখানেই কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিচ্ছেন আশপাশের মানুষ।

তবে এমন অনেক পরিবার আছে যারা বন্যার পানির মধ্যেই বাড়িতে অবস্থান করছে। নৌকা বা ঘরের ভিতর উঁচু মাচার উপর সংসার বেঁধেছেন তারা। বাঁধে বা পাকা সড়কে অবস্থান করা লোকজন একবেলা রান্না করে অথবা পার্শ্ববর্তী দোকান থেকে শুকনো খাবার কিনে খেতে পারলেও চরাঞ্চলের ঘর-বাড়িতে আশ্রয় নেয়া লোকজন নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন তাদের সঞ্চিত শুকনো খাবারের উপর।

সাধারণ এসব এলাকার এই সময়ের বন্যার পানি চার থেকে পাঁচদিন থাকে, সে কারণে এখানে বেশিরভাগ পরিবারই কয়েকদিনের শুকনো খাবার মজুদ করে রাখে। তবে এবারের বন্যা অনুমানের চেয়ে বেশি সময় ধরে অব্যাহত থাকায় খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমর, ফুলকুমরসহ ১৬টি নদ-নদী প্রবাহিত। প্রধান নদ-নদীর মধ্যে শুধু তিস্তার পানি কিছুটা হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তার অববাহিকার বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমরসহ বাকি নদ-নদীর অববাহিকার চরাঞ্চলগুলোর পানির নীচে থাকায় এসব এলাকার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।

এদিকে ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ১০২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ১২৩ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, জেলার ৯ উপজেলার ৫৬টি ইউনিয়নের প্রায় ২ লাখ পরিবারের সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি জীবন-যাপন করছে। এসব পানিবন্দি মানুষের জন্য এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ৫০০ মেট্রিক টন টাল ও ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৪৫০টি তাঁবু। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বেসরকারিভাবেও সামান্য পরিসরে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।

কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান জানান, নতুন করে বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে তা বন্যা কবলিত মানুষদের মাঝে দ্রুত বিতরণ করা হবে। বর্তমানে জিআর ক্যাশের টাকা দিয়ে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে শুকনো খাবার কিনে বন্যা কবলিত মানুষদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।

বন্যার পানির প্রবল চাপে জেলার রৌমারী, রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম সদর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, চিলমারী ও উলিপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধ ছিড়ে ও সড়ক-মহাসড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে তা ঢুকে পড়ছে উঁচু এলাকার গ্রামও হাটবাজারগুলোতে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ৪ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান ব্যাহতঃ

এদিকে বন্যা পরিস্থিতির কারণে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৭৫৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১২৮টি, মাদরাসা ৭০টি, কলেজ ১৭টি এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫৪০টি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ইতোমধ্যে পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। আরও চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের মুখে রয়েছে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শামসুল আলম জানান, বানের পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় জেলায় ২৭৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৮টি, ২২২টি মাদরাসার মধ্যে ৭০টি এবং ৬১টি কলেজের মধ্যে ১৭টিতে বন্যার পানি উঠেছে। এর মধ্যে ৫৫টি স্কুল, ১৭টি মাদরাসা ও ২টি কলেজ বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

মোঃ মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি