নুসরাত হত্যায় জড়িত ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের সুপারিশ করবে পিবিআই

মাদরাসা শিক্ষার্থী নুসরাত হত্যা মামলায় ফেনী আওয়ামী লীগের দুই নেতাসহ মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রস্তুত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আদালতের কাছে জড়িত ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সুপারিশ করবে পিবিআই। এ মামলায় ২১ জন গ্রেফতার হলেও তদন্তে বাকি পাঁচ জনের কোনো সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি সংস্থাটি।

আগামীকাল বুধবার এই মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হবে বলে জানান পিবিআইয়ের প্রধান ও পুলিশের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

আজ মঙ্গলবার ধানমন্ডির প্রধান কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, মামলার তদন্তে যাকেই জড়িত পাওয়া গেছে তাকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। চার্জশিট তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আইনের চোখে সবাই সমান। কেউ এখানে সুবিধা পাবে না। আইন অনুযায়ী যার বিরুদ্ধেই জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, চার্জশিটে তার নাম রেখেই তা আদালতে জমা দেওয়া হচ্ছে।

পিবিআই প্রধান বলেন, গত ১০ এপ্রিল নুসরাত হত্যা মামলার তদন্তভার পাওয়ার আগেই সোনাগাজী থানা পুলিশ সাত জনকে গ্রেফতার করে। এরা হলেন, আফসার উদ্দিন, কেফায়েত উল্যাহ, আরিফুল ইসলাম, আলা উদ্দিন, নূর হোসেন ওরফে হোনা মিয়া, সাইদুল ইসলাম ও উম্মে সুলতানা পপি। এদের মধ্যে কেবল মাদরাসা শিক্ষক আফসার উদ্দিন ও ছাত্রী উম্মে সুলতানা পপির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

এদিকে এর আগে থেকেই গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা গত ২৪ এপ্রিল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নুসরাত হত্যায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পাশাপাশি সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলমও এ ঘটনায় জড়িত রয়েছে বলে তথ্য দেন। তদন্ত এগুতে থাকলে নুসরাত হত্যায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, আফসার উদ্দিন, রুহুল আমিন, মাকসুদুল হক ও উম্মে সুলতানা পপিসহ মোট ১৬ জনের জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পায় পিবিআই। এদের মধ্যে ১২ জন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

পিবিআইয়ের প্রধান আরও বলেন, নুসরাত হত্যায় জড়িত এই ১৬ জনের মধ্যে আট জন হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। এর মধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজকে নির্দেশদাতা ও দুই আওয়ামী লীগ নেতাকে আশ্রয়দাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি পাঁচ জন উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মণি, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন ও সাইফুর রহমান জুবায়ের সরাসরি জড়িত ছিল নুসরাত হত্যায়। তারাই নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আগুন দেয়। আর বাকি আট জনও কোনো না কোনোভাবে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে জানিয়েছে পিবিআই।

বনজ কুমার বলেন, মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে ঘাতকরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। তারা স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ি চলে যায়। তারা মনে করেছিলো, এ ঘটনা আর প্রকাশ পাবে না। ধামাচাপা পড়ে যাবে। পাশাপাশি ঘটনার নির্দেশ দাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেও চলছিলো তারা।

এর আগে, নুসরাতকে যৌন হয়রানির অভিযোগে তার মায়ের দায়ের করা মামলায় গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দোলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে কারাগার থেকেই তিনি মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নুসরাতের পরিবারকে চাপ দিতে থাকেন। তাতে নুসরাত ও তার পরিবার রাজি না হলে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন অধ্যক্ষ। সেই অনুযায়ী, গত ৬ এপ্রিল নুসরাত তার মাদরাসার পরীক্ষায় অংশ নিতে গেলে তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে যায় অধ্যক্ষের সহযোগীরা। সেখানে তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় ওই দিন রাতেই নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। সেখানে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের ৯ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ডের অধীনে নুসরাতের চিকিৎসা চলে। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় নুসরাত মারা যায়।