‘মমতার’র রাজ্যে এবার চওড়া হাসি হাসবেন নরেন্দ্র মোদি

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোট গণনার শুরু থেকেই মোদি ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিলো। গণনা যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে বিজেপির বিরাট উত্থানের ইতিহাস। গত লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যে দলটি মাত্র দুটি আসন পেয়েছিলো। আর এবার মমতার দল তৃণমূলের সঙ্গে সমানে সমান টক্কর দিচ্ছে মোদির দল বিজেপি। 

এক সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব ছিল বামদের। তাদের সেই রাজত্বে ২০১১ সালে হানা দেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। সেবার বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়েছিল তার দল। ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, সারা ভারতেই রাজনৈতিক মহলে মমতা চাঞ্চল্য তৈরি করেছিলেন।

সে সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। মমতার নামে মানুষের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। একদিকে তার সাদাসিধে জীবনযাপন, অন্যদিকে কাউকে তোয়াক্কা না করার লড়াকু মনোভাব– দুইয়ে মিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠেছিলেন এক কথায় অপ্রতিরোধ্য। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাকে দিদি বলে সম্বোধন করেন। দিদির মধ্যে মানুষ দেখেছিল নিজেদের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্বপ্ন।

কিন্তু সেই পশ্চিমবঙ্গে এবার হানা দিয়েছে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনে সারাদেশে মোদি ঝড় বয়ে গেলেও পশ্চিমবঙ্গে এর আঁচ লাগতে দেননি মমতা।

এ পর্যন্ত ভোটের যে ফলাফল এসেছে, তাতে দেখা গেছে, বিগত বছরের তুলনায় ‘মমতার’র রাজ্যে এবার চওড়া হাসি হাসবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

প্রাপ্ত শেষ খবরে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গে ২২ আসনে এগিয়ে মমতার দল তৃণমূল। আর বিজেপি এগিয়ে আছে ১৯ ভোটে। আর কংগ্রেস এগিয়ে আছে মাত্র একটি আসনে। আর এ রাজ্যে দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বাম দল কোনো আসনও পায়নি। অর্থাৎ পুরোপুরি বাম শূণ্য হতে চলেছে এ রাজ্যটি।

নির্বাচনের শুরু থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৪২ আসনের সব ক’টি পাওয়ার আশা নিয়ে প্রচারণা শুরু করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছিলেন। যদিও তখন তার সঙ্গে সমান তালে লড়াইয়ে ছিল বিজেপি। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার নির্বাচনী সভায় উপস্থিত হয়ে ভোটারদের উদ্বেলিত করার চেষ্টা করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার সেনাপতি অমিত শাহ। এসব সভাকে কেন্দ্র করে গণ্ডগোলও কম হয়নি।

কিন্তু এখানে শেষ হাসিটা হাসছেন কিন্তু মোদিই। কারণ ৪২ আসন তো দূরের কথা, তৃণমূল এবার ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের চেয়েও অনেক কম আসন পেয়েছে।

এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে যে মোদির দল ভালো ফলাফল করবে তার আভাষ আগেই পাওয়া গিয়েছিলো। গত রবিবার শেষ দফা নির্বাচনের পর বুথফেরত জরিপেও এমনটাই বলা হয়েছিলো। যদিও মমতা এই জরিপকে ‘গসিপ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং ইভিএম কারচুপির অভিযোগ এনেছিলেন।

কিন্তু এত কিছু করেও নিজ দলের ভরাডুবি ঠেকাতে পারেননি তিনি। একই সঙ্গে মোদি বিরোধী জোট সরকার গঠন করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নও অধরাই থেকে যাচ্ছে মমতার।

শতাংশের বিচারেও ভোটপ্রাপ্তির নিরিখে জোর চমক দিচ্ছে বিজেপি। এখনও পর্যন্ত যা ভোটপ্রাপ্তির হার, তাতে বিজেপির ভোট ৩৯ শতাংশের আশেপাশে। তৃণমূলের ভোটপ্রাপ্তির হার খানিকটা বেশি, ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি।

বিজেপির ভোটপ্রাপ্তির এই হার ২০০৯ সালের নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে । সে নির্বাচনে বামেদের বিপর্যস্ত করে বাংলার ক্ষমতার রদবদলের ইঙ্গিত দিয়েছিল তৃণমূল। সেবার নির্বাচনে তৃণমূলের ভোটের হার ছিল ৩১.১৮ শতাংশ। তবে সে বার রাজ্যের ২৮টি আসনে তৃণমূল লড়েছিল।

বাকি ১৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল তৃণমূলের তৎকালীন জোটসঙ্গী কংগ্রেস এবং কংগ্রেস সে বার পেয়েছিল ১৩.৪৫ শতাংশ ভোট। আর বাংলার সে সময়ের শাসক দল বামফ্রন্ট পেয়েছিলো ৪৩.৩০ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ, এ বারের নির্বাচনে তৃণমূলও সেইরকম ভোট পেতে চলেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে কি আগামী লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বাম দলের মতই শ্রীহীন দশা হবে মমতার দলের? সময়েই বলে দিবে এই প্রশ্নের উত্তর।