ছাত্রলীগের কমিটিতে রাজাকারপুত্র-আসামি-মাদকসেবী!

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। এই কমিটিতে কারা পদ পেলো বা কারা পেলো না তা নিয়ে চলছে এখন নানা আলোচনা সমালোচনা।

সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পেয়েছেন হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি। রয়েছেন প্রাডো গাড়ি চড়া ঠিকাদার, মাদকসেবী, রাজাকারপুত্র, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত, অগ্নিসন্ত্রাসে যুক্ত, সংগঠনে নিষ্ক্রিয় ও অছাত্ররাও।

কেন্দ্রীয় কমিটির ২ নম্বর সহসভাপতি তানজিল ভূঁইয়া তানভীর, সহসভাপতি সুরঞ্জন ঘোষ ও সোহেল রানার বয়স ৩০ বছরের বেশি। সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের সদস্য পদই থাকার কথা নয়। মাদারীপুরের বাসিন্দা তানভীর ঠিকাদারী ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি সব সময় প্রাডো গাড়ি ব্যবহার করেন।

৫ নম্বর সহসভাপতি আরেফিন সিদ্দিকী সুজনকে এক সময় ইয়াবা সেবন ও মাদক রাখার অভিযোগে মাস্টারদা সূর্যসেন হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

৬ নম্বর সহসভাপতি আতিকুর রহমান খানের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক ও ইয়াবা সেবন এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মল চত্বরে পয়লা বৈশাখের কনসার্টে আগুন দেওয়ার অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে।

৭ নম্বর সহসভাপতির পদ পেয়েছেন বরকত হোসেন হাওলাদার। শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার অভিযোগে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়।

২০ নম্বর সহসভাপতি মো. তৌহিদুর রহমান হিমেল প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদারী ব্যবসায়ী। তিনি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) পড়াশোনা শেষ করে ঠিকাদারী ব্যবসায় যুক্ত হন।

আরেক সহসভাপতি মাহমুদুল হাসানের পরিবার জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সহসভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল গোপালগঞ্জে একটি হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি।

আরেক সহসভাপতি মাহমুদুল হাসান তুষারের বিরুদ্ধে পয়লা বৈশাখের কনসার্টে আগুন দেওয়ার অভিযোগ আছে।

দপ্তর সম্পাদক আহসান হাবীব সাবেক চাকরিজীবী এবং তাঁর বিরুদ্ধেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখের কনসার্টে আগুন দেওয়ার অভিযোগ আছে।

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. রাকিনুল হক চৌধুরী কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের আপন ছোট ভাই। তিনি ছাত্রলীগে নিষ্ক্রিয় বলে জানা গেছে।

ছাত্রলীগের ২ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ পাওয়া প্রদীপ চৌধুরী ২০১৪-১৫ সেশনে পরীক্ষায় নকলের দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার হয়েছিলেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে পহেলা বৈশাখের কনসার্টে আগুন দেওয়ার অভিযোগ।

দুই বছর মেয়াদি কমিটির ৯ মাস পার হওয়ার পর সোমবার বিকেল ৪টার দিকে ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এই কমিটির অনুমোদন দেন।

এর আগে দুপুরের দিকে তালিকা নিয়ে গণভবনে যান সংগঠনটির কেন্দ্রীয় দুই নেতা। তারা ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সদস্যদের সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন।

এর আগে গত বছরের ১১ মে ছাত্রলীগের ২৯তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনের পর কমিটি ঘোষণার নিয়ম থাকলেও শীর্ষ পদের নেতৃত্ব বাছাইয়ে সময় নেন শেখ হাসিনা। সম্মেলনের আড়াই মাস পর ৩১ জুলাই সংগঠনটির শীর্ষ দুই নেতার নাম প্রকাশ করা হয়।

এদিকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঘোষিত ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে বিতর্কিত ও অবৈধ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা। একপর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে তাতে হামলা চালিয়েছে সদ্য পদপ্রাপ্তরা।

এতে ছাত্রলীগের হল কমিটির সাবেক নেতাসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। সোমবার (১৩ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে এ ঘটনা ঘটে।

কমিটি ঘোষণার পর ছাত্রলীগের সভাপতি মো. রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি বিবৃতি দিয়েছেন।

পাঠকদের জন্য সেটাই এখানে তুলে ধরা হলো-

‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লাখো নেতা কর্মীদের যোগ্যতার বিচার করতে গেলে পোস্ট শুধুমাত্র পরিমাপের মাপকাঠি হতে পারে না।

আজকে যারা কমিটিতে পদ পান নি তাদের প্রতি আমার একটাই আহ্বান, আপনারা শিক্ষা-শান্তি-প্রগতি বুকে ধারণ করে রাজনীতি চালিয়ে যান। রাজনীতি একদিনের না এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। অপ্রাপ্তিকে শক্তিতে রূপান্তর করে নতুন উদ্দ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। এখানে হতাশ হবার কোনো সুযোগ নেই। আরও বেশি বেশি কাজ করে যেতে হবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আমাদের সবার প্রাণের সংগঠন, সুতরাং সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

আমি বিশ্বাস করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী কোন কর্মী সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এমন কোন কাজ করতে পারে না। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নতুন কমিটিকে অভিনন্দন…

জয় বাংলা

জয় বঙ্গবন্ধু’

তার এই স্ট্যাটাসে অনেকে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে পদবঞ্চিত।

মোহাম্মদ ইকবাল খন্দকার নামে একজন মন্তব্য করেছেন, ‌‘আজ কেন্দ্রীয় কমিটি দেখে বুঝলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া সারা বাংলাদেশে আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ ছাত্রলীগ করে না, শ্রমিক লীগ করে।’

এস এম রাশেদ নামে অপর একজন লিখেছেন, ‘মনে রাখবেন সভাপতি সেক্রেটারি চিরদিনের নয়।আপনাদের চেয়ে অনেক হাইভোল্টেজ নেতা অনেকে আসছে গেছে। তাদের কথাতো আপনাদের জানা। পদবী শেষ তাদের পিছনে ১০ জন নাই।আর রনিরা পদবী ছাড়া নেতা।রনিকে পদের জন্য নয় কর্মের জন্য পুরো বাংলার ছাত্র যুব সমাজ ভালোবাসে।’

মঈনুর রহমান মঈন নামে একজন মন্তব্য করছেন, ‘লজ্জিত। রগকাটাদের প্রেতাত্মা ভর করেছে ছাত্রলীগে। চরম দু:খ লাগছে……। অধিকার আদায়ে আন্দোলন হতেই পারে তাই বলে নিজের রক্তে নিজের হাত রাঙ্গানো!!! অশুভ লক্ষণ। আপার ছাত্রলীগ বলে বলে প্রাণের সংগঠন কে ধ্বংস করা হচ্ছে। ভাষা নেই….’

সোহেল হোসেন মন্তব্য করেছেন, ‘নারী নেত্রীর উপর এভাবে হামলা তাও মধুতে। শ্রাবনীরর উপর হামলাকারী যে হোক উপযুক্ত শাস্তির পাশাপাশি আজীবনের জন্য হামলাকারীদের বহিষ্কার করা হোক।’

এরকম আরো অনেক মন্তব্য রয়েছে স্ট্যাটাসটির কমেন্ট সেকশনে।

মাজহুরুল ইফতি মন্তব্য করেছেন, ‘ঢাবিতে না পড়ে ছাত্রলীগ করাটাই সবচেয়ে বড় ভুল। বেচে থাকুক তেলবাজ ট্যাগীরা হারিয়ে যাক ত্যাগীরা’

নানজিবা নুর মন্তব্য করেছেন, ‘প্রকৃত লীগাররা শিক্ষা-শান্তি-প্রগতি বুকে ধারণ করে ত্যাগি ট্যাগ লাগাবে আর দিন শেষে বিবাহিত সহ রাজাকার সন্তানরা পদ পাবে?? কি বলে আপনাদের বিবেক, প্রকৃত লীগাররা হারিয়ে যাক উদবাস্তুদের ভিরে? ক’জন ত্যাগি কমিটিতে?’

জিয়াউল হক শামিম লিখেছেন, ‘বিবাহিতরা ছাত্রলীগের কমিটিতে!! অসাধারণ কমেডি।

সাদিক খান, সহ-সভাপতি

সোহানী তিথি, সহ-সভাপতি

রুশি চৌধুরী, উপ-সম্পাদক।

আঞ্জুমান আরা অনু,সহ-সম্পাদক

ভাই পদ টা বেশি কিছু না

কিন্তু ত্যাগি কর্মী এদের ঠকিয়ে কেমনে এদের দিয়ে কমিটি দিবেন?’

অপরদিকে এই কমিটির বিষয়ে কথা বলতে সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

অপমানিত করলেন- ‘পদত্যাগ করলাম, সব আপাকে জানাবো’

ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে ভ্রাতৃপ্রীতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যেই পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে নতুন কমিটিতে উপ-কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক আল মামুন। তিনি ছাত্রলীগের গত কমিটিতে উপ-মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সোমবার (১৩ মে) বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানির স্বাক্ষরিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে আল-মামুন লিখেন- ‘গত কমিটিতে উপসম্পাদক ছিলাম। কার ভেটোতে এই কমিটিতেও উপসম্পাদক রেখে অপমানিত করলেন। সবকিছু আপার কাছে পরিষ্কার করবো। আমি পদত্যাগ করলাম।’

এ বিষয়ে আল মামুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। গত কমিটিতে আমাকে উপসম্পাদক করা হয়েছিল, এবারো উপসম্পাদক দিয়ে অপমান করেছে বর্তমান কমিটির সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। আমার সমবয়সী যাদের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে অনেক দূর এগিয়ে থাকার পরও আমার যোগ্যতার যেহেতু মূল্যায়ন করা হয়নি, তাই আমি এই ছাত্রলীগ আর করবো না।’

আল মামুন বলেন, ‘আমার সঙ্গে যারা রাজনৈতিক মাঠে সমান বা কম সক্রিয় ছিল তারা সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পেয়েছে। কিন্তু আমাকে আগের অবস্থানেই রেখে দিয়ে আমার যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। আমি বিষয়টি আমার অভিভাবক জননেত্রী শেখ হাসিনাকে জানাবো।’

এদিকে ছাত্রলীগ ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ডাকসুর ১২ জন নেতা পদ পেয়েছেন।