নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দামি ব্র্যান্ডের সেমাই

পবিত্র রমজানকে ঘিরে রাজধানীতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স ও সনদপত্র ছাড়া নামি ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করে ভেজাল সেমাইসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছেন তারা। পরে যা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বাজারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে হাতে গ্লোবস ছাড়াই তৈরি হচ্ছে সেমাই। মানা হচ্ছে না পরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরির কোনো নিয়মনীতিও। ঈদকে সামনে রেখে অস্থায়ী এসব কারখানায় দিন-রাত চলছে সেমাই তৈরির কাজ। অধিক মুনাফার আশায় এসব সেমাইয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের ময়দা, পামওয়েলসহ পোড়া তেল।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পোড়া তেল, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি সেমাই ক্যানসার, লিভার ও কিডনির সমস্যা, ডায়রিয়া ও টাইফয়েড হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। রাজধানীর মধ্যেই এমন অর্ধশতাধিক নকল সেমাই তৈরির কারখানার তালিকা এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। রমজানের প্রথম দিন থেকেই এসব প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করে অভিযান শুরু করেছেন ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু একের পর এক অভিযান চালিয়েও অসাধু এসব ব্যবসায়ীকে ঠেকানো যাচ্ছে না।

বৃহস্পতিবার (৯ মে) রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের আশরাফাবাদ এলাকায় ভেজাল সেমাই কারখানায় অভিযান চালান র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। দুপুর ১২টার দিকে হাবিবা ফুড প্রডাক্টের কারখানার মধ্য দিয়ে অভিযান শুরু হয়। এই কারখানা থেকেই সারাদেশে বিভিন্ন দামি ব্র্যান্ডের জন্য সেমাই সরবরাহ করা হতো। ভেজালবিরোধী এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য সুনিশ্চিতের লক্ষ্যে রমজানের আগেও ভেজাল খাবার তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় রমজানেও বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

গতকাল অভিযানে হাবিবা ফুড কারখানায় গিয়ে চারদিকের ধুলাবালির মধ্যেই সেমাই তৈরির চিত্র দেখতে পায় র‍্যাব। এ সময় র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে দিগ্বিদিল ছোটাছুটি শুরু করে প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম বলেন, ওপরে টিনের চাল। চালে ধুলা-ময়লার কুণ্ডলী। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। শ্রমিকদের কারো হাতে নেই গ্লাভস। এই অবস্থাতেই ওই কারখানায় তৈরি হচ্ছিল সেমাই। এ সেমাই প্যাকেজিং হয়ে যাচ্ছে একমি, ডেকোসহ দেশের নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এসব বাজারে বিক্রি করছে তারা।

ম্যাজিস্ট্রেট আরো জানান, হাবিবা ফুড নামে কারখানাটিতে লাচ্ছা, দুধ সেমাইসহ বেশ কয়েক রকমের সেমাই তৈরি হতো। শ্রমিকরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তারা একমি, ডেকো, শাহী মদিনা, বোম্বের মতো ব্র্যান্ডের জন্য সেমাই তৈরি করেন। এ প্রতিষ্ঠানে গত বছরও অভিযান চালানো হয়েছিল। তাদের অবস্থা আগের চেয়ে একটু ভালো। তবে কিছু বিষয় এখনো ঠিক না করায় প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে সতর্ক করা হয়েছে। একই অভিযানে কামরাঙ্গীরচরের বড় গ্রাম এলাকার রহমান গলিতে সোনিয়া কনজ্যুমার গুডসের কারখানায় অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেখানে নিম্নমানের রাসায়নিকে তৈরি বিপুল পরিমাণে রোজ শরবত, চাটনি, বরইয়ের আচার, লজেন্স ইত্যাদি পাওয়া যায়। অভিযানের খবর পেয়েই কারখানা থেকে পালিয়ে যায় মালিক।

পরে কাউকে না পেয়ে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করেন আদালত। একই দল ইসলামনগরের কাদের ফুড প্রোডাক্টসে অভিযান চালায়। প্রতিষ্ঠাটি বিভিন্ন ফলের আইসক্রিম তৈরি করত। কিন্তু তাদের প্রস্তুতকৃত আইসক্রিমে ফলের কোনো অস্তিত্ব পাননি আদালত। মালিককে খুঁজে না পাওয়ায় এখান থেকে সাড়ে তিন হাজার কার্টন আইসক্রিম জব্দ করে র‌্যাব। রমজান মাসে ভেজাল ও পচা-বাসি খাবার প্রস্তুত প্রতিরোধে গতকাল রাজধানীর বেইলি রোড ও নিউমার্কেট এলাকার বেশকিছু দোকানেও অভিযান চালান ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালত। সকাল থেকে চলা অভিযান শেষে চার দোকানের মালিককে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুতের অভিযোগে চারটি দোকানকে জরিমানা করা হয়েছে। অভিযান চলে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার বনলতা কাঁচাবাজারেও। সেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি করায় নিউমার্কেটের ফলপট্টি এলাকার সিরাজের খেজুরের দোকানকে ৫ হাজার টাকা, মেসার্স আল্লার দান স্টোরকে ১০ হাজার টাকা ও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করায় কাঁচাবাজার এলাকার হাবিবের দোকানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রমজান মাসে ভেজাল, পচা-বাসি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত প্রতিরোধে ডিএমপির এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মামুন।