রোজার তাৎপর্য বর্ণনা করলেন এক অমুসলিম ভারতীয়

রমজান আশীর্বাদ ও সমবেদনার মাস। এই মাসের সিয়াম সাধনা মুসলিম ও অমুসলিম উভয়কেই অনুপ্রাণিত করে। কাতারে অনেক অমুসলিম প্রবাসী রয়েছে, যারা রোজা পালন করেন। মুসলমানদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে এ ধর্মীয় আচার পালন করেন তারাও।

জগদীশ চন্দ্র কৃষ্ণভাট একজন কাতার প্রবাসী ভারতীয়। কাতারে রমজানের চমৎকার অভিজ্ঞতা লাভ করছেন তিনি। দেশটিতে আসার পর পবিত্র মাস সম্পর্কে তার একটি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি তিনি ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করেন অন্যদের সঙ্গে।

দেশটিতে আবারো রমজান ফিরে আসায় জগদীশ খুব খুশি। তিনি বলেন, এর আগে এ মাস সম্পর্কে ভাবার অবকাশ ছিল না আমার। যখন প্রথম মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছালাম, আমি এই মাসের বিধিনিষেধ আত্মস্থ করার চেষ্টা করি। আমি বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করি। কয়েক বছরের মধ্যে আমি এর চেতনা ও মূল্যবোধটি বুঝতে পারি।’

জগদীশ বলেন, ভারতে আমার কয়েকজন মুসলিম বন্ধু ছিল। তাদের কাছে রোজা সম্পর্কে জানতে পারি। আমি প্রায়ই তাদের ইফতার আয়োজনে যোগ দিতাম। তারপরও রোজা ও রমজান মাস সম্পর্কে পুরো ধারণা ছিল না আমার।

নির্মাণ শিল্পে চাকরি নিয়ে ২০০৩ সালে প্রথম ওমান যান জগদীশ। তিনি বলেন, রমজানের গুরুত্ব আমি তখন টের পাই। দেখেছি, তারা সারা দিন নির্মাণ কাজে শ্রম দিচ্ছে। অথচ, এই কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও রোজা পালন করছেন। সূর্যের প্রখর তাপ কিংবা কঠোর পরিশ্রম- কোনো কিছুই তাদের রোজা পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তাদের এই দৃঢ় বিশ্বাস দ্বারা আমি প্রভাবিত হই। এরপর আমি দুবাই ও আবুধাবি ভ্রমণ করি। সেখানেও রমজানে সবার ভেতর একই অভ্যাস দেখেছি।

যাইহোক, কাতারে এসে জগদীশ রমজানের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে শুরু করেন। তিনি বলেন, আমার বিভিন্ন মুসলিম বন্ধুদের (বিশেষ করে মোহাম্মদ আসাদ) সঙ্গে আলোচনা করি। বুঝতে পারি রমজানের মূল্যবোধের ধারণাটি প্রশংসাযোগ্য। আমি শিখেছি, রোজা মানে কেবল খাবারগ্রহণ থেকে বিরত থাকা নয়, এটি আসলে আরো পবিত্র এবং আরো গভীর। রোজা ইসলামের স্তম্ভের একটি। এটি একজন অনুশীলনকারী মুসলমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আত্মশুদ্ধি প্রক্রিয়া।

জগদীশ আরো বলেন, রোজা আমার নিজের ধর্মের ওপর কোনো বিদেশি ধারণা নয়। এটি একটি আধ্যাত্মিক যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। রোজা বিষয়ে জানার পরও আমি আমার শৈশব বা যুবক বয়সে এ ধর্মীয় আচার পালন করতাম না। অনেক পরেই আমি শুরু করেছি। অন্য মানুষদের দিকে তাকিয়ে।

তিনি বলেন, কাতারে প্রথমবারের মতো রোজা রাখার চেষ্টা করেছি। রমজান মাসে, আমি বেশ কয়েকবার উপবাস থেকেছি – সম্ভবত আমার সহকর্মীদের সঙ্গে একাত্মতার কারণে। তিনি মনে করেন রোজা পালন করতে গিয়ে মানুষের ক্ষুধার কষ্ট উপলব্ধি করা যায়। ফলে এর মধ্য দিয়ে দরিদ্রদের প্রতি সমবেদনা তৈরি হয়।

কেননা, রোজার সময়, একজন মানুষ তার মৌলিক চাহিদা খাবার কিংবা পানীয় গ্রহণ করতে পারে না। এই সময় রোজাদার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এতে মানুষের ভেতর যে বোধ জন্ম নেয়, তার মূল্য অপরিসীম। এর মধ্য দিয়ে মানুষের প্রতি সমবেদনা ও সেবার মনোভাব তৈরি হয়। রোজার ভেতরেই অনেকে সেবামূলক  কাজ করে, প্রচুর লোককে খাবার, অর্থ এবং পোশাক প্রদান করে। আমি অনেক মুসলিম সহকর্মীকে দেখি যারা শিল্প এলাকায় কর্মীদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করেন।

রমজানকে কেন্দ্র করে সামাজিক বন্ধন প্রক্রিয়ারও প্রশংসা করেন জগদীশ। তিনি বলেন, ‘আমি সব জায়গায় দেখেছি, ইফতারের সময় আশপাশের সব মানুষ একত্রিত হয়। মুসলিম বন্ধুরা ইফতারে যোগ দিতে সকল স্তরের মানুষ, ধর্মের মানুষকে স্বাগত জানান। এটি ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বিকাশে এক দুর্দান্ত উপায়। আমি এমন কোন রমজান মনে করতে পারছি না, যখন ইফতার আয়োজনে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

সব মিলিয়ে, আমি আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি, রমজান একটি মহান মাস। এটি শান্তি, সমবেদনা, কৃতজ্ঞতা এবং সেবার মতো সব ইতিবাচক দিকগুলো প্রকাশ্যে নিয়ে আসে বলেন জগদীশ।