ভিকারুননিসায় দুই বছরে অতিরিক্ত ৪২৫ শিক্ষার্থী ভর্তিঃ মাউশি’র রিপোর্ট

ভিকারুননিনা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠার পরে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পদ্ধতি পরিবর্তন এনে লটারি সিস্টেম চালু করার পরেও বন্ধ হয়নি অনিয়ম। চলছে আগের মতই মতোই অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের (অডিট রিপোর্ট) তথ্য বলছে গত দুই বছরে স্কুলটিতে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত অতিরিক্ত ৪২৫ শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হয়েছে। অর্থ নিয়ে এসব শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়েছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।

এ বিষয়ে মাউশি’র (মাধ্যমিক) পরিচালক অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান জানান, ‘যেকোনও প্রতিবেদন আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠাই এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিই। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনা দেবে, আমরা তা বাস্তবায়ন করবো।’ প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ভর্তি থেকে বিরত থাকার সুপারিশ করা হয়েছে ।

অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এত সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি আমার ধারণার বাইরে। কীভাবে অতিরিক্ত ভর্তি হলো তা আমি জানি না। এটি আসলে একাডেমিক বিষয়। তদন্তে যেহেতু এসেছে বিষয়টি দেখা হবে। পরিচালনা পর্ষদের কোনও সদস্য যদি এতে জড়িত থাকে, তাহলে বিষয়টি আমি দেখবো।’

এ বিষয়ে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘আমি নতুন করে দায়িত্ব নিয়েছি। ভর্তি কার্যক্রম আমার সময়ে হয়নি। আগে যারা ছিলেন তারা এ বিষয়ে জবাব দিতে পারবেন।’

অতিরিক্ত ভর্তির বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হাসিনা বেগম বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষদের কিছু করার থাকে না। ভর্তি কার্যক্রমে সরাসরি এখতিয়ারে থাকে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদ। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে আমি দায়িত্ব নিয়েছিলাম। পরে দায়িত্ব থেকে আমাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের পুরো কার্যক্রমের দায় আমার নয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাধিক শিক্ষক বলেন, মাউশির তদন্ত কর্মকর্তারা এসে জেনে গেছেন পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও একজন শিক্ষকসহ এই ঘটনায় আরও কারা জড়িত আছেন। সভাপতি আরেকজন শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে অতিরিক্ত ভর্তির বিষয়টি দেখভাল করেছেন। তবে ওই শিক্ষককের নাম প্রকাশ করতে চাননি শিক্ষকরা।

মাউশি সূত্রে জানা গেছে, ভিকারুননিসার তিন বছরের পারফরমেন্স অডিট রিপোর্ট সম্প্রতি মাউশিতে জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি। ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক সাখায়েত হোসেন বিশ্বাসের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি এই প্রতিবেদন তৈরি করেন। নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে অতিরিক্ত ভর্তি হয়েছে ২১৩ জন। সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণি ছাড়া প্রতি শ্রেণিতেই অতিরিক্ত ভর্তি করা হয়। চলতি বছর (২০১৯) প্রতিটি শ্রেণিতেই অতিরিক্ত ভর্তি করা হয়েছে। এবার প্রথম শ্রেণিতে সর্বাধিক ১৬০ শিক্ষার্থী অতিরিক্ত ভর্তি করা হয়। প্রথম শ্রেণিতে মোট এক হাজার ৮৯২ আসনের বিপরীতে ভর্তি করা হয়েছে ২ হাজার ৫০ জন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫৬, তৃতীয় শ্রেণিতে ৯৪, চতুর্থ শ্রেণিতে ৩৯, পঞ্চম শ্রেণিতে ৩১, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১১, সপ্তম শ্রেণিতে ২৫, অষ্টম শ্রেণিতে ২ এবং নবম শ্রেণির বিজ্ঞান শাখায় ৭ জনসহ মোট ৪২৫ জনকে অতিরিক্ত ভর্তি করা হয়।

অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর গত বছরের ৫ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন, ‘নিয়মের বাইরে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়। এ বিষয়ে আমি আগেও বলেছি। কিন্তু কোনও অভিভাবক অভিযোগ করেন না। সেখানে ১০ লাখ টাকা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করেন। সেটা বন্ধ করতে আমরা লটারি সিস্টেম চালু করেছিলাম। কিন্তু তারা অনেক বেশি ছাত্রী তারা ভর্তি করে। এ থেকে বোঝাই যায়, কেন তারা অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করেন।’

ভবিষ্যতে যেন অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির কারণে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নতুন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির কাছে আবেদন জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তাদের দাবি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’