শিশুদের খেলার জন্য বাঁশের তৈরি ‘ব্যাম্বো প্লে-স্কোপ’ উদ্বোধন

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ধাবমান এই সময়ে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ক্রমশই কৃত্রিমতায় হারিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই মানুষ হলেও ক্রমশই প্রকৃতির ছোঁয়া থেকে দূরে থেকে যাচ্ছে এই মানবগোষ্ঠী। আধুনিক নগরায়ন ও ডিজিটাল শিল্প বিপ্লবের এই সময়ে শিশুদের খেলা ও বিনোদন এর মূল অনুষঙ্গ এখন ভিডিও গেইমস। ফুটবল খেলছে তো গেমসে আর ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জিতছে তো সেটাও ভিডিও গেমসে। এমতাবস্থায় মানবশিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ক্রমশ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। স্বাস্থ্যকর ও প্রকৃতিবান্ধব খেলার জায়গার বড়ই অভাব আজ নগর সভ্যতায়।

এমনই একটা সংকটকে সামনে রেখে বছর দু’য়েক আগে একটা প্রকল্প হাতে নেয় গবেষণাধর্মী স্থাপত্যশিল্পের প্রতিষ্ঠান ‘পারা’। রাজধানীর মুহাম্মদপুর সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীর কোলঘেঁষে অবস্থিত কেরানীগঞ্জ উপজেলার ওয়াশপুর গার্ডেন সিটিতে সুবিধাবঞ্ছিত ও ভাগ্যাহত পথশিশুদের উদ্ধার পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের লক্ষ্যে লিডো প্রতিষ্ঠিত পিস হোমের পাশেই একটা খোলামেলা জায়গায় গড়ে তোলা হয় বাঁশের তৈরি একটি খেলার জায়গা।

দু’বছর আগের সেই প্রকল্প ইতোমধ্যে দেশে বিদেশে বেশ কিছু এ্যাওয়ার্ড পেয়েছে এবং প্রশংসিত হয়েছে। অস্থায়ী তবে নান্দনিক এই প্রকল্পে তখন সাথে ছিল বুয়েট, ব্র্যাক ও শাবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থী এবং পারা’র স্থপতিবৃন্দ।

বিগত এই প্রকল্পের পথ ধরে এবং সেই প্রকল্পের ভালোমন্দ বিচার বিশ্লেষণ করে নতুনভাবে ও আকর্ষণীয় ডিজাইনে এবং টেকসই বিনির্মাণে পারা সম্প্রতি নির্মাণ করেছে ব্যাম্বো প্লে-স্কোপ। পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সদা ব্যাপৃত স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক উন্নয়নধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘লোকাল এডুকেশন এন্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-লিডো’ প্রতিষ্ঠিত পিস হোম সংলগ্ন একটি জমিতে এই খেলার জায়গাটি তৈরি করা হয়।

বিগত এক মাসের নিরলস পরিশ্রমের পর শুক্রবার (৩ মে) এই ব্যাম্বো প্লে-স্কোপের উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। টানা নিম্নচাপ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করেও শিশুদের প্রতি সহৃদয়বান প্রায় ৩ শতাধিক মানুষের সমাগম ঘটেছে। যার মাঝে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও তথ্য কমিশনার মোহাম্মদ জমিরসহ দেশি-বিদেশি নানান শ্রেণী-পেশার মানুষজন উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণাধর্মী স্থাপত্যশিল্পের প্রতিষ্ঠান ‘পারা’ প্রতিনিয়ত বাস্তবিক অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। সাম্প্রতিক এই কেডসে প্রল্পটি বাছাইকৃত শিক্ষার্থীদের মাঝে বুয়েট ও ব্র্যাক ইউনিভারসিটির দুটো দল যৌথভাবে পারার দক্ষ স্থপতিবৃন্দ ও প্রকৌশলীদের সহায়তায় বাস্তবায়ন করেছে। শিক্ষার্থীদের এই ব্যতিক্রমী ডিজাইন ও পরিকল্পনা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে উৎসর্গ করা হয়েছে।

পিস হোমের শিশুরা ছাড়াও এলাকার অন্যান্য শিশুদের জন্যও এই জায়গা উন্মুক্ত থাকবে। পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পিকনিক এবং বনভোজন ইত্যাদির জন্যও কিছু অনুদানের বিনিময়ে এই ব্যাম্বো প্লে-স্কোপ ব্যবহার করা যাবে। ওয়াশপুর গার্ডেন সিটির ৬ নাম্বার রোডের এই ব্যাম্বে প্লে-স্কোপে রয়েছে স্পাইডার নেট, কৃত্রিম ক্লাইম্বিং বেলে, দোলনা ইত্যাদি।

অর্ধ-দিনব্যাপী আর্ট ফ্যাস্টিভ্যাল নানাবিধ নান্দনিক অনুষ্ঠানমালায় পূর্ণ ছিল। খ্যাতিমান নাট্যকার ও অভিনয়শিল্পী আজাদ আবুল কালাম প্রতিষ্ঠিত নামী নাট্যদল প্রাচ্যনাট ও জলপুতুল পাপেটের সহযোগে পিস হোমের শিশুদের বানানো নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে এই ব্যাম্বো প্লে-স্কোপ জুড়ে।

প্রসিদ্ধ লালন ব্যান্ডের ভোকালিস্ট আনুশেহ আনাদিল প্রতিষ্ঠিত হস্তশিল্প ও ফ্যাশন ব্র্যান্ড যাত্রা নৃত্যশিল্পীদের মাধ্যমে তাদের রংবাজি কালেকশনের ফ্যাশন শো, উদীয়মান তরুণ ফ্যাশন ডিজাইনার আফসানা ফেরদৌসির ব্লু স্মাইল প্রকল্পের টি-শার্ট প্রদর্শনী, এপিফেনিয়া ভিজুয়ালস এর চারুকলা প্রদর্শনী হিরক রাজার দেশে নাটক অবলম্বনে এবং বিট বক্স এর সৌজন্যে লাইভ একাপেলা ইত্যাদি দিয়েই শেষ হয়েছে এই আর্ট ফ্যাস্টিভ্যাল ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।

স্থপতি রুহুল আবেদিন, প্রিন্স ও আরেফিনদের এই প্রচেষ্টার কথা স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন লিডোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ডিরেক্টর এডমিন এন্ড ফাইনান্স মুরশিদা আক্তার কান্তা। পারার প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি রুহুল আবেদিন এর কণ্ঠে স্বপ্ন ঝরে পড়েছে। আরো এমন প্রকল্প করতে চান যাতে পরিবেশ ও প্রকৃতির বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পায় ঢাকার মানুষ এবং খেলার সুষ্ঠু পরিবেশ পায় শিশুরা।