চার মাস আগে নিজেই মোটরসাইকেল চালানো শিখেছিলেন লাবণ্য

সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে মারা যাওয়া ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক লাবণ্য (২১) খুব মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে ছিল। ক্লাসে সে সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলতো। শুধু তাই নয়, লাবণ্য ছিল অনেক মেধাবী ছাত্রী। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায়। এরপর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সাইন্সে ভর্তি হয়।

গেল চার মাস আগে নিজেই মোটরসাইকেল চালানো শিখেছিলেন। সেই ভিডিও করে শেয়ারও করেছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে লিখেছিলেন, এটা সহজ কাজ। আর সেই মোটরসাইকেলেই প্রাণ হারালেন রাজধানীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাহমিদা হক লাবণ্য।

পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিং সেবা ‘উবার মোটো’তে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিলেন লাবণ্য। এ সময় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটসংলগ্ন রাস্তায় পিকআপভ্যানের চাপায় নিহত হন তিনি।

এ দুর্ঘটনার পর ফাহমিদা হক লাবণ্য ফেসবুক পেজটি ‘রিমেম্বারিং’ করা হয়। সেই পেজে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মোটরসাইকেল চালানোর ভিডিওটা পোস্ট করেন লাবণ্য। ওপরে লেখা ছিল, ‘ওয়েল.. দ্যাট ওয়াজ ইজি।’

লাবণ্য সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর অনেকেই এখন তার ফেসবুক পেজে গিয়ে সেই ৪৮ সেকেন্ডের ভিডিওটা শেয়ার দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ফুলবাড়িয়া উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুলশিক্ষক মোয়াজ্জেম হোসেনও একজন। সেখানে অনেকেই শোক প্রকাশ করছেন, পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাচ্ছেন। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা মহামারি আকার ধারণ করছে বলেও কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ বা অভিযোগ করেছেন, চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না থাকার কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়ে লাবণ্যদের প্রতিনিয়ত হারিয়ে যেতে হচ্ছে।

মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, লাবণ্য ফুলবাড়ীয়া উপজেলার হরিপুর গ্রামের ইমদাদুল হকের মেয়ে। তাঁদের পরিবার ঢাকায় থাকে। বছরের বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠানের সময় তারা গ্রামের বাড়ি আসতেন।

শুক্রবার ভোরে উপজেলার হেমায়েতপুরে নানার কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়েছে বলে জানান মোয়াজ্জেম। মোটরসাইকেল চালানো শেখার ভিডিওটা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যে মাঠে লাবণ্য মোটরসাইকেল চালানো শিখছেন, সেটা উপজেলার গোপীনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই স্কুলটি লাবণ্যর পৈতৃক গ্রাম হরিপুরের পাশের গ্রাম।’

গতকাল দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক লাবণ্য।

এদিকে লাবণ্যর মৃত্যুর খবর পেয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে ভিড় জমান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ঘাতক কাভার্ডভ্যান চালক ও উবার রাইডারের বিচারের দাবি করেন।

এদিকে লাবন্য নিহত হওয়ার ঘটনায় ‘পলাতক’ উবার মোটরসাইকেল চালক সুমন হোসেনকে খুঁজে পেয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের নেতৃত্বে মোহাম্মদপুর নবীনগর হাউজিংয়ের ২নং রোডের ২৫নং বাসার ছয়তলা থেকে সুমনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। পরে তাকে সোহরাওয়াদী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একইসঙ্গে লাবণ্যকে বহনে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও (ঢাকা মেট্রো হ ৩৬-২৩৫৮) হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। তবে ঘাতক কাভার্ডভ্যান ও চালককে এখনও খুঁজে পায়নি শেরেবাংলা থানা পুলিশ।

ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার উবার চালক সুমনের বরাত দিয়ে জানান, ‘ঘটনার দিন সকালে রাজধানীর কলেজ গেটে অবস্থান করছিলেন সুমন। লাবণ্যের কল পেয়ে সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে উবার চালক সুমন তাকে ফোন দেন। লাবণ্য খিলগাঁও ছায়াবীথি মসজিদের সামনে যেতে চান জানিয়ে সুমনকে শ্যামলী ৩ নং রোডের ৩১নং বাসার সামনে আসতে বলেন।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছামাত্র একজন লোককে বাইকের সামনে দৌঁড়ে রাস্তা পার হতে দেখে সুমন ব্রেক করেন। এ সময় একটি কাভার্ডভ্যান পিছন থেকে ধাক্কা দিলে আহত হন লাবণ্য। আহত হন নিজেও। এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা হয়েছে (মামলা নং ৫০)।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) নুরুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর উবার চালক সুমন ‘পলাতক’ ছিল। তাকে আটক করা হয়নি। চালক হিসেবে তার অবহেলা বা ইচ্ছাকৃত ভুল ছিল কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশি নজরদারির মধ্যে তিনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তিনি বলেন, ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হচ্ছে ঘাতক কাভার্ডভ্যান। সেই কাভার্ডভ্যানের চালক পলাতক। তাকে আটকের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।