সড়ক নিরাপত্তায় রাজধানী থেকে রিকশা তুলে দেওয়ার সুপারিশ

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টায় সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি ১১১ দফা সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদনের খসড়া তৈরি করেছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে ‘সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ‘ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অবিলম্বে সড়ক পরিবহন আইনের বিধিমালা জারি, সড়ক উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পের ৫ শতাংশ অর্থ সড়ক নিরাপত্তার জন্য রাখা, রাজধানী থেকে রিকশা তুলে দেওয়াসহ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য ১১১ দফা সুপারিশের একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে গঠিত সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ কমিটি।

এছাড়া এই সুপারিশে প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে ‘সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ‘ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ৪ এপ্রিলের আগেই এই সুপারিশমালা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন শাজাহান খান। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে ‘সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনয়ন এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটি’র ওই খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

‘সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনয়ন এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটি’র ওই খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।”

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান বলেছেন, আগামী ৪ এপ্রিলের আগেই এই সুপারিশমালা মন্ত্রণালয়ে জমা দেবেন তারা।

খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি স্কুলের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা, সড়ক উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পের ৫ শতাংশ অর্থ সড়ক নিরাপত্তার জন্য রাখা, জেলা ও উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ক্ষমতা বৃদ্ধি, চালক প্রশিক্ষণে সরকারি খরচে ইন্সট্রাক্টর তৈরির কার্যক্রম নেওয়া, ইন্সট্রাক্টর নিয়োগে সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের অগ্রাধিকার দেওয়া, চাকরিতে নারী চালকদের অগ্রাধিকার দেওয়া, ট্রাফিক পুলিশের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ, রাজধানী থেকে রিকশা তুলে দেওয়া, রাইড শেয়ারিং কোম্পানির জন্য গাড়ির সংখ্যা বেঁধে দেওয়া, কেবল লাইসেন্সধারী চালকদের মোটরসাইকেল বিক্রি করা, দৈনিক ভিত্তিতে চালক নিয়োগ না দেওয়া, চালকদের সুনির্দিষ্ট মজুরি নির্ধারণ, রাস্তায় প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে বাস রুট ফ্রাঞ্চাইজি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন, সড়কে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা।

কমিটি একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও শৃঙ্খলার বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা এবং বাস্তব অবস্থার সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করেছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা ও ২০১১ সালে গঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ড. আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সুপারিশগুলোও আমলে নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুপারিশগুলো দিয়েছে এই কমিটি।

কমিটির এই সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সবার মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন নাটিকা ও বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড, স্ক্রিন, বাসের টিকেট ও গণমাধ্যমে বিনামূল্যে প্রচার বাধ্যতামূলক করতে হবে। সেক্ষেত্রে দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনও নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে মিডিয়াকে বিরত থাকতে হবে। স্কুল কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক আইন, রাস্তা পারাপার ও গাড়িতে উঠানামা মনিটরিং করার ব্যবস্থা করতে হবে।

দক্ষ চালক তৈরির বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষিত লোক দিয়ে দক্ষ চালক তৈরির জন্য দেশের সব জেলায় মানসম্মত ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এ বিষয়টি বিআরটিএর উদ্যোগে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদী ব্যাংক ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে খসড়া প্রতিবেদনে। এছাড়া নারী চালক বাড়ানোর বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে বলা হয়েছে, শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করা, যেসব জায়গায় ফুটপাত নেই সেখানে ফুটপাত নির্মাণ, স্কুল কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সামনে উঁচু করে জেব্রাক্রসিং নির্মাণ এবং সড়ক বিভাজকে পথচারীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে সেখানে।

গত বছরের জুলাই মাসে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার পর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সে সময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া বাস্তবায়নের আশ্বাস দেয় সরকার।

এর ধারাবাহিকতায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৬তম সভায় সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানকে প্রধান করে পরিবহন মালিক, শ্রমিক, পুলিশ, গবেষক ও বিআরটিএসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ২২ সদস্যের এই কমিটি করা হয়।

এ কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবং বর্তমান সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গাঁ, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী, কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ। সদস্য হিসেবে আছেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন।