জাবির ছাত্রী হলে গোপনে কন্যাসন্তানের জন্ম, ফেসবুকে বয়ফ্রেন্ডের স্ট্যাটাস

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের একটি কক্ষ থেকে ট্রাঙ্কবন্দী অবস্থায় এক নবজাতককে উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বিকেল ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

গোপনে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন জাবির উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের আবাসিক ছাত্রী। এ সময় ভয়ে সন্তানকে ট্রাঙ্কে তালাবদ্ধ করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য রুমমেটকে অনুরোধ করেন ছাত্রী। পরে বিষয়টি হল প্রশাসনকে জানানো হলে ওই ছাত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরই মধ্যে কান্নার শব্দ শুনে ছাত্রী হলের ট্রাঙ্ক থেকে নবজাতককে উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধারের পর নবজাতকটিকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে নবজাতকের মৃত্যু হয়। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকের বরাত দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর তাজউদ্দিন সিকদার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

হলের শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুপুর আড়াইটার দিকে ওই ছাত্রীর রুমমেট ও আশেপাশের কক্ষের শিক্ষার্থীরা তার প্রসব বেদনার কথা জানতে পারেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে জানালে নার্স এসে তাকে এনাম মেডিকেল কলেজে নিতে বলেন।

কিন্তু এর আগেই সন্তান ভূমিষ্ট হলে কাউকে না জানিয়ে নবজাতককে ট্রাঙ্কে তালাবদ্ধ করে রাখেন তিনি। এক পর্যায়ে ওই ছাত্রীকে এনাম মেডিকেলে নেওয়ার পর তার কক্ষে নবজাতকের কান্নার আওয়াজ পান অন্য শিক্ষার্থীরা।

খোঁজাখুজি করে কক্ষে থাকা ট্রাঙ্ক থেকে তালা ভেঙে নবজাতককে উদ্ধার করে হল প্রশাসন। পরে নবজাতককে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এনাম মেডিকেল পাঠান।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রের দায়িত্বরত চিকিৎসক আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ বলেন, ‘নবজাতককে যখন মেডিকেলে আনা হয়, তখন তার শরীর সম্পূর্ণ নীল রং ধারণ করেছিল। অক্সিজেন দিয়ে স্বাভাবিক করে এনাম মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। এখন বাচ্চাটি সুস্থ আছে বলে জানতে পেরেছি।’

এ বিষয়ে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মুজিবর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনা শুনে সঙ্গে সঙ্গে হলে যাই। কান্নার আওয়াজের ভিত্তিতে কক্ষের ট্রাঙ্ক ভেঙে নবজাতককে উদ্ধার করি এবং এনাম মেডিকেলে নিয়ে যাই।’

নবজাতক ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রাখার ঘটনায় অপরাধ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তথ্য গোপন করাটা অপরাধ। অনেক বড় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারতো। এই ঘটনা তদন্তে হলের সহকারী আবাসিক শিক্ষক লাবিবা খাতুন তানিয়াকে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।’

এদিকে গোপনে সন্তান জন্ম দেয়া সেই ছাত্রীর বয়ফ্রেন্ডের খোঁজ পাওয়া গেছে। ছাত্রীর বয়ফ্রেন্ডের নাম রনি মোল্লা। তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তার বাড়ি পাবনায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে রনি মোল্লা পড়াশোনা করেছেন পাবনার শহীদ সরকারি বুলবুল কলেজে। একই কলেজে পড়াশোনা করেছেন গোপনে সন্তান জন্ম দেয়া সেই ছাত্রীও। তাদের দুজনের বাড়ি পাবনায়। একই জেলায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুজনই হলে থাকার সুযোগে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয় তাদের মধ্যে।

তাদের সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই ছাত্রীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে রনি মোল্লার। একপর্যায়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তারা। এরই মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন ছাত্রী। এরপরও বিষয়টি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত হয়। তবে এ নিয়ে ছাত্রীর সঙ্গে রনির একাধিকবার বাগবিতণ্ডা হয়। বিষয়টি নিয়ে তাদের সম্পর্কের অবনতিও হয়েছে।

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মুজিবর রহমান বলেন, ঘটনা শুনে সঙ্গে সঙ্গে হলে যাই। কান্নার শব্দে কক্ষের ট্রাঙ্ক ভেঙে নবজাতককে উদ্ধার করি এবং এনাম মেডিকেলে নিয়ে যাই। তবে বাচ্চাটাকে বাঁচানো যায়নি। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাচ্চাটি মারা যায়।

এদিকে সন্তান জন্মের ঘটনার পর থেকে মোবাইল বন্ধ করে রেখেছেন রনি মোল্লা। ক্যাম্পাসে আসেননি তিনি। এরই মধ্যে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা জানিয়ে সন্তানের পিতৃত্বের দাবি করেছেন রনি মোল্লা।

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, ‘আমার সঙ্গে ওই ছাত্রীর প্রেমের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ওই সন্তানের বাবা আমি। বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটেছে। এ নিয়ে কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না।’