জরুরী সেবায় দেশের নাগরিকের অন্যতম পছন্দ ৯৯৯

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করে দেশের যে-কোনো জায়গা থেকে জরুরি সেবা চাওয়া যায়৷ বাংলাদেশের অনেক নাগরিকই এখন গ্যাসের লাইনের লিকেজ থেকে শুরু করে আত্মহত্যাকারীকে থামানোর জন্য সহায়তা চেয়ে ফোন করেন এই নাম্বারে। সম্প্রতি দু’টি আত্মহত্যা চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে এই সেবা হইচই ফেলে দিয়েছে৷

কয়েকদিন আগে মোহাম্মদপুরের এক পরিবারের সদস্যরা পটুয়াখালী বেড়াতে গিয়ে ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করে জানান তাদের বাসায় বিবাহিত অন্য বড় ভাই দাম্পত্য কলহের কারণে আত্মহত্যা করতে চলেছেন৷ এ ঘটনায় মাত্র ছয় মিনিটে পুলিশ পৌঁছে যায় মোহাম্মদপুরের বাসায়৷ তাঁকে উদ্ধার করা হয়৷ জীবন রক্ষা পায়৷

ঐ ব্যক্তির বোন নওশীন আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা তখন কী করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না৷ সবাইকে বিষয়টি বলাও যায়না৷ হঠাৎ আমার ৯৯৯-এর কথা মনে পড়লো৷ ভাবলাম ফোন করে দেখি যদি কোনো সহায়তা পাওয়া যায়৷ ফোন করলাম৷ এরপরই দ্রুত ঘটনা ঘটতে থাকে৷ মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ মাত্র ছয় মিনিটের মধ্যে বাসায় গিয়ে আমার ভাইকে উদ্ধার করে৷

তিনি বলেন, অনুরোধ করেছিলাম আমরা ঢাকা না আসা পর্যন্ত আমার ভাইকে যেন পুলিশের কাছে রাখা হয়৷ তারা তাই করেছেন৷ পুলিশের এই আচরণে আমি মুগ্ধ এবং বিস্মিত৷ আমরা যে ধরণের পুলিশকে চিনি এরা তার ঠিক উলটো৷ এত মানবিক আচরণ পাব তা কল্পনাও করতে পারিনি৷

কলসেন্টারের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মিরাজুর রহমান জানান, এখানে জরুরি সেবাগুলোই আমরা দেয়ার চেষ্টা করি৷ বিষয়টি পুলিশের হলে আমরা যে এলাকার ঘটনা সেই এলাকার পুলিশকে সংযুক্ত করি৷ ফায়ার সার্ভিস বা অন্য কোনো বিভাগের হলে আমরা তাদের সংযুক্ত করি৷ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুনের ঘটনায়ও ফার্ষ্ট রেসপন্ডার ছিল ৯৯৯৷ ওখানকার একজন কর্মচারী আমাদের প্রথম ফোন করেন৷ আর সম্প্রতি দু’টি আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনা রোধ করে আমরা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছি৷

কত কল আসে?

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়ার পর এপর্যন্ত প্রায় ১৭ লাখ কলে সেবা দিয়েছে ৯৯৯৷ এখন প্রতিদিন গড়ে ১৩-১৪ হাজার কল আসে৷ এরমধ্যে ১৮ থেকে ২০ ভাগ কলে সেবা দেয়া হয়৷ আর অনেক কল আসে যা শেষ পর্যন্ত সার্ভিসের উপযুক্ত হয়না৷ অনেকে কৌতূহলী হয়েও ফোন করেন৷ আর শিশুরাও ফোন করে৷ তারা অনেকটা মজা করার জন্যই ফোন করে৷

নাগরিকরা যে ধরনের সেবা চান

পুলিশের এই কল সেন্টারের কল জরিপেই দেখা যায় যত কল আসে তারমধ্যে শতকরা ৭৫ ভাগই হলো পুলিশি সহায়তা চেয়ে৷ এরপরেই রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তার জন্য, শতকরা ২০ ভাগ৷ আর অ্যাম্বুলেন্সের জন্য শতকরা পাঁচ ভাগ৷ ঢাকাসহ সারাদেশের সরকারি এবং বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবাদানকারী হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠান এখন ৯৯৯-এর সঙ্গে যুক্ত৷ এই নাম্বারে ফোন করা সহজ বলে নাগরিকরা এখন ফায়ার সার্ভিসের অনেক ডিজিটের নাম্বারে ফোন না করে এখানেই ফোন করেন৷ পুলিশের যেসব সেবা নাগরিকরা চান, তার মধ্যে অপরাধের তাৎক্ষণিক প্রতিকার চাওয়া ছাড়াও বিভিন্ন অপরাধের তথ্যও দেন৷

যেভাবে চিহ্নিত করা হয়

কেউ কল করলে তার ঘটনা জানার পর তার অবস্থান নিশ্চিত হয় কল সেন্টার৷ যিনি ফোন করেন তিনি তার অবস্থান বলেন৷ আশপাশের স্থাপনা বা কোনো দোকান, হোটেল রেস্টুরেন্টের নাম বলেন৷ এরপর কল সেন্টার থেকে ডিজিটাল ম্যাপের মাধ্যমে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে সবচেয়ে কাছের থানা, পুলিশ ফাঁড়ি বা টহল পুলিশের গাড়ির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে তাঁর কাছে পৌঁছানো হয়৷

মোট জনশক্তি

কল সেন্টারে এখন মোট জনশক্তি ৪৭০ জন৷

কল সেন্টার নিয়ে জনসচেতনতার কাজও করা হয়৷ চলতি সপ্তাহেই পাবনার একটি স্কুলের সাথে কল সেন্টার প্রোগাম করা হয়৷ স্কুলের শিক্ষার্থীদের সেখান থেকে কলসেন্টারে কল করে সরাসরি শিখানো হয় কীভাবে কলসেন্টারে কল করে সেবা নিতে হয়৷

‘উচ্ছ্বাস আছে, সেবা না পাওয়ারও অভিযোগ আছে’

এএসপি মিরাজুর রাহমান বলের, ‘‘দক্ষিণ এশিয়ায় এই ধরণের ৯৯৯-এর মাধ্যমে জরুরি সেবা বাংলাদেশেই প্রথম৷ আমরা নাগরিকের যেমন সাড়া পাচ্ছি, তেমনি আমরাও আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি তাদের সেবা দিতে৷”

রেসপন্ড টাইম আরো কমে যাবে

রেসপন্ড টাইম কমানোর জন্য প্রত্যেক থানা পর্যায়ে একটি করে ডিসপার্স সিস্টেম দেয়া হয়েছে৷ প্রত্যেক মেট্রোপলিটন থানায় গাড়িতে একটি করে মোবাইল ডাটা টার্মিনাল স্থাপন করা হয়েছে৷ এগুলো অনলাইনে যুক্ত করা হয়েছে৷ ফলে কোনো কলারের অবস্থান এবং তার নিকটবর্তী থানা চিহ্নিত করা যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে৷ ফলে রেসপন্ড টাইম কমে আসবে৷

পুলিশের ভাবমূর্তিতে পরিবর্তন?

মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, পুলিশের এই কলসেন্টার নিয়ে যেমন উচ্ছ্বাস আছে, তেমনি সেবা না পাওয়ারও অভিযোগ আছে৷ তারপরও এটা পুলিশের একটা ইতিবাচক কাজ৷ মানুষ নতুন একধরনের মাধ্যমে সেবা পাচ্ছে৷ তবে এই কাজ দিয়ে পুরো পুলিশের ভাবমূর্তি পরিবর্তন সম্ভব নয়৷ এর জন্য পুলিশের পুরো প্রক্রিয়ায় আমুল পরিবর্তন আনতে হবে৷ পুলিশ তার ভাবমূর্তি পরিবর্তন করতে চাইলে বেআইনি কাজ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে থেকে বিরত থাকতে হবে৷