সভ্যতার আদি থেকেই জাদুবিদ্যা, তাতে আধুনিকতার ছোঁয়া এঁকেছেন ম্যাজিশিয়ান রাজু

সভ্যতার আদি থেকেই জাদুবিদ্যা আর জাদুকর বিষয়ে মানুষের প্রচণ্ড রকম আগ্রহ। আমরা সকলে শুধু এটুকুই জানি বা মনে করি, ম্যাজিক মানে অতিপ্রাকৃতিক কিছু হওয়া বা করা। অর্থাৎ, জাদু হলো এমন অতিপ্রাকৃত শক্তি বা ক্ষমতা, যা দ্বারা অসম্ভব কিছু করা যায়, যেমন মানুষকে অদৃশ্য করা অথবা প্রাকৃতিক ঘটনা (বিষয়) নিয়ন্ত্রণ করা। তবে বাংলাদেশের প্রখ্যাত জাদুশিল্পী রাজুর কাছে জাদু এমন একটি শিল্প যা মানুষকে হাসাতে পারে, আনন্দ দিতে পারে, হতাশা থেকে মুক্তি দিতে পারে।অর্থাৎ জাদু মানুষকে বিনোদন দিতে সক্ষম। 

ম্যাজিক শব্দটা শুনলেই মনে পড়ে যায় বিশ্বের বড় বড় সব জাদুকর যেমন পি সি সরকার, জুয়েল আইচ, রবার্ট হুডিনি বা ডেভিড কপারফিল্ড এর মত বিশ্বখ্যাত জাদুকরদের নাম। ইংরেজি ‘ম্যাজিক’ শব্দের উদ্ভব হয়েছে ফারসি শব্দ মাজি থেকে। প্রাচীনকাল থেকেই গ্রীক এবং পারসিয়ানরা শত শত বছর ধরে যুদ্ধ করে আসছিল এবং ফার্সি ভাষায় মাজশ নামে ফার্সি পূজারী গ্রীক ভাষায় মাজু নামে পরিচিত ছিল। পারস্য প্রজাদের আনুষ্ঠানিক কাজগুলি মাজিয়া নামে পরিচিত হয়েছিল, তারপর ম্যাজিকা-যা শেষ পর্যন্ত কোনও বিদেশী, অপ্রতিভ, বা অবৈধ আচার অনুষ্ঠানকে বোঝানো হত। জাদুবিদ্যার মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’ভাবধারাই বিদ্যমান। হিরোডোটাস, প্লেটো প্রমুখ জাদুকে ক্রিয়াশীল হিসেবে ইতিবাচক বিবেচনা করেছেন।অ্যারিস্টটল এর নেতিবাচক ব্যবহার দেখিয়েছেন। ইংরেজী শব্দ ‘ম্যাজিক’ নেতিবচিক অর্থের উত্তরাধিকারী।

অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত জাদু প্রদর্শন মেলাগুলিতে বিনোদনের একটি সাধারণ উৎস ছিল। আধুনিক বিনোদন জগতের একজন প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্ব ছিলেন জিন ইউজেন রবার্ট-হাউডিন, যিনি ১৮৪৫ সালে প্যারিসে একটি জাদু থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জন হেনরি এন্ডারসন ১৮৪০-এর দশকে লন্ডনে একই পদ্ধতির প্রবর্তন করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বড় বড় নাট্যমঞ্চে জাদু প্রদর্শন করা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিনোদনের একটি ফর্ম হিসাবে জাদু সহজেই নাট্যমঞ্চ থেকে টেলিভিশনের জাদুতে স্থান করে নিয়েছিল। আধুনিক পর্যবেক্ষকেরা যে পরিচর্যায় চিনতে পেরেছিলেন তা সমগ্র ইতিহাস জুড়ে প্রচলিত হয়েছে।বহু শতাব্দী ধরে জাদুকররা শয়তান ও আধ্যাত্মিকতার সাথে জড়িত ছিল। উনিশ শতকে এবং বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মঞ্চের জাদুকররাও তাদের বিজ্ঞাপনে এই ধারণার ব্যবহার করেছিলেন। ঐতিহ্যবাহী তাৎপর্যের যে একই মাত্রাটি প্রাচীন প্রতারণা যেমন টাওয়ার হর্স হিসাবে ব্যবহার করা হতো, সেটি বিনোদনের জন্যও ব্যবহার করা হতো বা কমপক্ষে অর্থের গেমসে প্রতারণার জন্য একে ব্যবহার করা হত।অনেকে অশিক্ষিত মানুষকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করতে বা তাদের অনুসারী বানানোর জন্য প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুশীলনকারীদের ব্যবহার করা হত।যাইহোক, জাদুমন্ত্রের পেশাটি শুধুমাত্র অষ্টাদশ শতকের দিকে শক্তি লাভ করেছিল এবং তখন থেকেই জাদু বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় অস্পষ্টতা উপভোগ করেছিল।

জাদুশিল্পী শব্দটা শুনলেই মনে জন্ম নেয় অনেক প্রশ্নের। কারণ জাদু মানেই অবাক করা তাক লাগানো বিস্ময়।কি থেকে কি হবে বা কি হয় তার রহস্য কখনই কেউ সমাধান করতে পারেনি।সভ্যতার আদিকাল থেকে এখন পর্যন্ত জাদু নিয়ে মানুষের নানা ধারণা। শেষ নেই রহস্যের বা জল্পনা কল্পনার। জাদুশিল্পী এবং জাদু নিয়ে কথা হলেই এক অজানা ভয় যেন সবাইকে করে শিহরিত। তবে এখন পুরো বিশ্বে জাদুশিল্প একটি বিনোদন মূলক পেশা। বাংলাদেশে জাদুশিল্পের ততটা কদর না থাকলেও আনেকেরই আগ্রহ রয়েছে এ শিল্প নিয়ে। গোড়ে উঠেছে বিখ্যাত সব জাদুকরের।

বাংলাদেশে জাদুবিদ্যার ইতিহাস অতি প্রাচীন। সেই তখন থেকে আজ পর্যন্ত জাদুর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে কজন সেরা জাদুকরের নাম করা যাবে, তাদের মধ্যে যিনি সর্বশীর্ষে, তার নাম জাদুসম্রাট প্রতুলচন্দ্র সরকার, যিনি বিশ্বের কোটি কোটি জাদুপ্রিয় মানুষের কাছে পি. সি. সরকার নামেই সমধিক পরিচিত।জাদুর ইতিহাসে যিনি এক কিংবদন্তি পুরুষ। ১৯৫৬ সালের ৯ই এপ্রিল যাদুশিল্পী পি সি সরকারের জাদু আতংকিত করেছিল ব্রিটিশদের। জাদুকর এ আই পিন্টু, কিশোরবেলায় জাদুবিদ্যায় হাত পাকিয়ে প্রায় অর্ধশত বছর বয়সেও জনাকীর্ণ রাজপথে চোখ বাঁধানো অবস্থায় মোটরসাইকেল চালাতে পারেন তিনি।তখন ট্রাফিক কনস্টেবলও বুঝে উঠতে পারেন না কি করবেন।মঞ্চে তো আরও কয়েক কাঠি সরেস।মানব মস্তিষ্কের (নিউরণ) যত নিউক্লিয়াস আছে সবগুলোকেই কিলবিল করে নাচিয়ে এতটাই সম্মোহন করেন যে, পিনপতন নীরবতায় তাক লেগে যায় দর্শক।

জাদুশিল্পী রাজু, দেখতে খুবই সাধারণ একজন মানুষ তিনি। কিন্তু তার গুণের নেই শেষ। চমকপ্রদ জাদুর পাশাপাশি ছবি আঁকা, বাঁশি বাজানো, রান্না করাও তার শখ।পড়া লেখা করেছেন মাইক্রোবায়োলজিতে। তার মতে জাদুশিল্পী মানে এক ধরণের অভিনেতা যিনি জাদুকরের ভুমিকায় অভিনয় করছেন। আর তখনই একজন জাদুশিল্পী সার্থক যখন তার চমকপ্রদ জাদু কারো মুখে হাসি ব বিস্ময় ফুটিয়ে তুলতে পারে। শুধু তাই নয় তার মতে জাদু মানেই সব সময় ভয়ঙ্কর কিছু নয়। জাদু সব বয়সের সবার জন্য। জাদু ও জাদুশিল্পী নিয়ে এমন আরো অনেক কথা জানিয়েছেন তিনি। তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হল তিনি জাদু দেখান রাজপথে সাধারণ মানুষের মাঝে। খেটে খাওয়া পরিশ্রান্ত মানুষ গুলোর মুখে এক চিলতে হাসি ফোটান তার জাদুর ছোঁয়ায়।জাদু দেখিয়ে অনেক সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। কুড়িয়েছেন শত মানুষের ভালবাসা। শুধু দেশের মাটিতেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ও বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন গুনি এই জাদুশিল্পী।

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশে শুধু গ্রামগঞ্জে বিভিন্ন মেলায় সার্কাসে জাদু দেখান হত।মেলার মুল আকর্ষণই থাকত জাদু শিল্পীদের নানা রকম আশ্চর্যজনক কর্মকাণ্ড। মাথার টুপি থেকে কবুতর বের হওয়া, কোটের পকেট থেকে ফুল, ফিতা বের করে আনা, হাতে ডিম নিয়ে গায়েব করে দেয়া এ সমস্ত জিনিস প্রচণ্ড ভাবে আনন্দ দিত মানুষকে।তবে দিন বদলের সাথে সাথে গ্রামীণ এই ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে গেলেও হারিয়ে যায়নি জাদু বিদ্যা। দিন পেরুতেই আরও আধুনিকতার ছোঁয়া যেন লেগেছে জাদুশিল্পতে। পরিসরও বেড়েছে অনেক। বিশ্বজুড়ে নাম কামিয়েছে জুয়েল আইচের মতন বড় শিল্পীরা। বিশ্বের প্রায় প্রতীতি জায়গায় দাপটের সাথে জাদু দেখিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাদু শিল্পীরা। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচিতি দিয়েছেন তারা। বহিঃবিশ্বে দেশের মাথা উঁচু করার হাতিয়ার হিসেবে নিজেদের জাদুচর্চাকেই বেছে নিয়েছেন এই জাদুশিল্পিরা।তুলে ধরছেন জাদুর হাজার বছরের ঐতিহ্যের ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস কেবল সামনে চলার। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এই গুণী শিল্পীরা বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

দেশের মাটিতে জাদু শিল্পীদের জনপ্রিয়তার কমতি নেই। তবে অনেকের মনে একটা প্রশ্ন তৈরি হয় যে ম্যাজিক কি শুধু লোককে ঠকানো? প্রতারণা করা? কিছুটা তো বটেই৷ কিন্তু এর বাইরে ম্যাজিক হলো একটা বিশুদ্ধ শিল্প৷ পারফর্মিং আর্ট৷ যে-ভাবে মঞ্চে একজন গায়ক কিংবা বাদক তাঁর শিল্প প্রদর্শন করে শ্রোতা-দর্শককে মুগ্ধ করেন, একজন ম্যাজিশিয়ান বা জাদুকরও তাঁর ট্রিক দেখিয়ে বা ইলিউশন বা ভ্রম সৃষ্টি করে দর্শকের তারিফ এবং মুগ্ধতা অর্জন করে নিতে পারেন৷ বিজ্ঞান এবং কৌশলকে নির্ভর করে দর্শককে সম্মোহিত করে রাখাই হলো একজন জাদুকরের কাজ৷ শুরুতে জাদুশিল্পের চাহিদা কম থাকায় এ শিল্প চর্চার ক্ষেত্রে মানুষের আগ্রহ ছিল কম। একটা সময় জাদুবিদ্যা শিখতে চাইলেই শেখা যেতো না৷ কারণ, ম্যাজিক আজও এমন গুপ্ত এক বিদ্যা যা চট করে কেউ কাউকে শেখাতে চান না৷ এমনকী আজও চিকিত্‍সকদের মতো ম্যাজিশিয়ানদেরও শপথ বা ‘ওথ’ নিতে হয়৷ ‘একজন জাদুকর হিসেবে আমি শপথ করছি কোনও অ-জাদুকরের কাছে জাদু-কৌশল প্রকাশ করবো না৷’ তবে বর্তমানে এর চাহিদা অনুযায়ী বেড়েছে কদর।কোন অনুষ্ঠানে একটু ম্যাজিক শো না থাকলে যেন জমেই না।বিশেষ করে বাচ্চাদের বেশ আগ্রহ থাকে ম্যাজিক এর প্রতি।শুধু মনোরঞ্জনই নয় জাদুবিদ্যায় অবদানের জন্য শিল্পীরা পাচ্ছেন নানান পুরস্কার।

কিন্তু একজন দক্ষ স্টেজ ম্যাজিশিয়ান বা ইলিউশনিস্ট হওয়া যে খুব সহজ কাজ, তা একেবারেই নয়৷ ঠিক যেভাবে একজন পেন্টার ক্রমশ দক্ষ-শিল্পীতে রূপান্তরিত হন, একইভাবে একজন আনকোরা নতুন জাদুকরও রূপান্তরিত হন জাদুসম্রাটে৷ একদিনে হয় না৷ দক্ষতা অর্জন করতে হয় এবং এর পাশাপাশি প্রয়োজন প্রতিভার৷ প্রতিভা না থাকলে যেমন ছবি আঁকতে জানলেই পিকাসো হওয়া যায় না, তেমনই সামান্য ম্যাজিক জানলেই হুডিনি হয়ে ওঠাও সম্ভব নয়৷