নারীকে অপহরণের ঘটনায় ২০১২ সালে গ্রেফতার হয়েছিল পলাশ

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজ বিজি-১৪৭ ছিনতাইয়ের ঘটনায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেনা কমান্ডোর গুলিতে বিমান ছিনতাইকারী মাহাদী নিহত বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর)। তবে টিকিটে তার নাম মো. মাজিদুল বলে জানা গেছে।

তবে নিজেদের সংরক্ষিত ক্রিমিনাল ডাটাবেজ অনুযায়ী র‍্যাব দাবি করছে, নিহতের নাম পলাশ আহমেদ। সে র‍্যাবের তালিকাভুক্ত অপরাধী। সোমবার এক ক্ষুদে বার্তায় তার এই পরিচয় জানিয়েছে র‍্যাব। তবে গতকাল পর্যন্ত তার নাম মাহাদী বলে জানা যাচ্ছিল।

পলাশ আহমেদকে ২০১২ সালে এক নারীকে অপহরণের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। সোমবার দুপুর ৩টায় র‍্যাব সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সংস্থাটির লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।

তিনি বলেন, ২০১২ সালের মার্চ মাসে পলাশ আহমেদ ও তার এক সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়। তার অপরাধ ছিল, সে একজন নারীকে অপহরণ করে আট লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। র‍্যাবের ক্রিমিনাল ডেটাবেইজ অনুযায়ী তার জন্মসাল ১৯৯৪। অর্থাৎ ২০১২ সালে গ্রেফতারের সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর। সে সময় গ্রেফতারের পর নিজেকে বিবাহিত বলে দাবি করে পলাশ। শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি সমমানের। সে মাদরাসা বোর্ডের শিক্ষার্থী ছিল।

মুফতি মাহমুদ খান জানান, উড়োজাহাজ ছিনতাই চেষ্টার ওই ঘটনার পর র‍্যাব-৭ ঘটনাস্থলে যায়। র‍্যাবের বোমা ডিস্পোজাল ইউনিট কাজ করে। তার শরীরে বিস্ফোরক সদৃশ যা পাওয়া গেছে তাতে কোনো বিস্ফোরক ছিল না। এটা ফেক একটা জিনিস ছিল, যেখানে ভুয়া তার-সার্কিট দিয়ে ভেস্টের মতো তৈরি করা হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে কমান্ডো অভিযানে নিহত হন মো. পলাশ আহমদ। তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার পিরিজপুর ইউনিয়নের দুধঘাটা গ্রামে।

র‍্যাবের দাবি, তাদের ডেটাবেইজের তথ্য অনুযায়ী, ওই যুবকের নাম মো. পলাশ আহমেদ। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের দুধঘাটা এলাকার পিয়ার জাহান সরদারের ছেলে তিনি। সে বিমানের ফ্লাইটটিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল। বিমানের যাত্রী তালিকা অনুযায়ী নাম উল্লেখ ছিল AHMED/MD POLASH। তার সিট নম্বর ছিল ১৭-এ।

রোববার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কমান্ডো অভিযানের পর সেনা ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, নিহত ব্যক্তির নাম ‘মাহাদী’, তার বয়স ২৬/২৭ বছর।

পলাশের বাবা পিয়ার জাহান জানান, ১৯৯০ সালে কাজের উদ্দেশ্যে সে ইরাক যায়। সেখানে চার বছর থাকার পর দেশে ফিরে আসে। পরে আবার সৌদি আরব চলে যায়। ২০১২ সালে সে দেশে ফেরে।

তিনি আরও জানান, পলাশ নাকি ঢাকায় চলচ্চিত্রে কাজের চেষ্টা করেছিল। তখন বাড়ির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না। মাঝে মাঝে বাড়িতে এলেও এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশতো না, কথা বলতো না।

পিয়ার জাহান বলেন, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে চিত্রনায়িকা সিমলাকে নিয়ে রাতের বেলা বাড়িতে আসে পলাশ। মেয়েটিকে চিত্রনায়িকা ও তার প্রেমিকা বলে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। দুই মাস পর আবার সিমলাকে বাড়িতে নিয়ে আসে এবং স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়।

‘বিয়ের কথা সিমলাও আমাদের কাছে স্বীকার করে। ওই রাতেই তারা আবার ঢাকায় চলে যায়। সর্বশেষ ২০-২৫ দিন আগে পলাশ বাড়িতে আসে। বাড়িতে আসার পর তার আচরণে বিরাট পরিবর্তন দেখা দেয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করে, মসজিদে গিয়ে আজানও দেয়। গত শুক্রবার বাড়ি থেকে যাওয়ার আগে বলে যায়, সে কাজের সন্ধানে দুবাই যাবে।’

গতকাল রাতে শাহ আমানত বিমানবন্দরে কমান্ডো অভিযান পরিচালনার পর সংবাদ সম্মেলনে পলাশের বিস্তারিত তথ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি সেনা ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারা। রোববার রাতে তার কাছে যে অস্ত্রটি পাওয়া গেছে সেটি একটি ‘খেলনা পিস্তল’ বলে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুবর রহমান জানান।

রোববার বিকেলে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া দুবাইগামী বিজি-১৪৭ ফ্লাইটটি এক অস্ত্রধারী যুবক ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। পরে বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে উড়োজাহাজটি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। বিমান ছিনতাই চেষ্টাকারী সন্দেহভাজন অস্ত্রধারীকে ধরতে কমান্ডো অভিযান পরিচালিত হয়। এরপর ছিনতাইকারীর নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে রুদ্ধশ্বাস ওই অভিযান শেষ হয়। ফ্লাইটটিতে ১৩৪ জন যাত্রী ও ১৪ জন ক্রু ছিল।

পলাশ কেন বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালিয়েছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়। সে ক্রুদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বারবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। তবে পাইলট ও ক্রুরা সুকৌশলে বিমানটি চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করান।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল নাইম হাসান বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পারি স্ত্রীর সঙ্গে বিবাদের জের ধরে সো-কলড ছিনতাইকারী বিমানটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলতে চেয়েছিলেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। বিমানটির খবর আমরা জানতে পেরে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। পিএম অফিসেও আমরা কথা বলি। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী আমাদের কিছু নির্দেশনা দেন, সেই নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হয়।’