ভারতীয় নয়, খাওয়ানো হচ্ছে দেশীয় কোম্পানির উৎপাদিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল

সারাদেশে আজ অনুষ্ঠিত হয়েছে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন। এবার রাজধানীসহ সারাদেশে চলমান ভিটামিন ‘এ’প্লাস ক্যাম্পেইনে ভারতীয় নয়, দেশীয় কোম্পানির উৎপাদিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী প্রায় ২৫ লাখ ৪৭ হাজার শিশুকে একটি করে নীল রংয়ের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় এক কোটি ৯৫ লাখ ৭ হাজার শিশুকে একটি করে লাল রংয়ের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দেশের প্রায় আড়াইকোটি শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।

বাচ্চার বয়স কত? সকালে কী খেয়েছে? বাসায় গিয়ে ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়াবেন। শনিবার দুপুর ১২টায় আজিমপুর নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মনোয়ারা বেগম নামে এক বৃদ্ধা তার নাতিকে ভিটামিন ‘এ’ক্যাপসুল খাওয়াতে আসলে কর্তব্যরত পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) এ প্রশ্নগুলো করেন।

প্রশ্নের উত্তরে সন্তুষ্ট হলেই কেবল ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। শূন্য থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুকে একটি নীল রঙের ভিটামিন ‘এ’ক্যাপসুল এবং ১২-৫৯ মাস বয়সী শিশুকে একটি করে লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ওই এফডব্লিউভি বলেন, সম্প্রতি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অজান্তেই এক ধরনের ভীতি লক্ষ্য করছেন। কোনো একটি শিশু যেন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে অসুস্থ হয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে তারা শিশুটির প্রকৃত বয়স, কতদিন আগে সর্বশেষ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছিল, সকাল থেকে কী কী খাওয়ানো হয়েছে, ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাইয়ে বাসায় ফেরার পর শিশুটিকে কী ধরনের খাবার খাওয়াতে হবে সে সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছেন। সকালের দিকে ভিড় কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকরা শিশুদের টিকা কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন বলে ওই তরুণী জানান।

সরেজমিন পরিদর্শন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, আজ রাজধানীসহ সারাদেশে চলমান ভিটামিন ‘এ’প্লাস ক্যাম্পেইনে ভারতীয় নয়, দেশীয় কোম্পানির উৎপাদিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। লাল সবুজের মোড়কের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মেয়াদ সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। মোড়কের গায়ে প্রতিটিতে ৫০০ ক্যাপসুল, সংরক্ষণ পদ্ধতি, উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের রেজিস্ট্রেশন নম্বর, ব্যাচ, উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ লেখা রয়েছে।

সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দেশের প্রায় আড়াই কোটি শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কার্যক্রম চলছে।

দুপুর সাড়ে ১২টায় আজিমপুর নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নার্গিস নামে এক গৃহবধূ বলেন, গত ১৯ জানুয়ারি ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে মানহীন ক্যাপসুল খাওয়ানোর অভিযোগে তা স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে ৯ ফেব্রুয়ারি পুনরায় তারিখ ঘোষণা করা হয়। ওই সময় পত্রপত্রিকায় মানহীন ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছিল বলে শুনেছিলেন। তাই আজ ভয়ে ভয়ে সন্তানকে টিকা খাওয়াতে আসি। তবে স্বাস্থ্যকর্মীর কথা শুনে ভীতি কমে গেছে।

একই সঙ্গে আন্তঃব্যক্তি যোগাযোগ ও গণমাধ্যমের (সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেল, বাংলাদেশ বেতার, কমিউনিটি রেডিও এবং বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকা) সহায়তায় জন্মের পরপর (১ ঘণ্টার মধ্যে) শিশুকে শালদুধ খাওয়ানোসহ প্রথম ৬ মাস শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো এবং শিশুর বয়স ৬ মাস পূর্ণ হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পরিমাণমতো সুষম খাবার খাওয়ানো বিষয়ে প্রচারাভিযান চালানো হবে।

শিশুদের রাতকানা ও অপুষ্টি দূর করতে ১৯৭৪সাল থেকে এ ক্যাম্পেইন পরিচালিত হচ্ছে। যখন এই কার্যক্রম গ্রহণ করেন তখন ০৬-৫৯ মাস বয়সী  শিশুদের মাঝে রাতকানা রোগের হার ছিল ৩.৭৬ শতাংশ। জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো অব্যাহত রাখার ফলে বর্তমানে ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবজনিত রাতকানা রোগের হার শতকরা ১ ভাগের নিচেই রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ছাত্র শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ সকলের সার্বিক সহযোগিতায় দেশব্যাপী ১ লাখ ২০ হাজার স্থায়ী কেন্দ্রসহ অতিরিক্ত আরও ২০ হাজার ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রগুলো বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, ব্রিজের টোল প্লাজা, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু ব্রিজ, দাউদকান্দি ও মেঘনা ব্রিজ, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, খেয়াঘাট ইত্যাদি স্থানে অবস্থান করবে। প্রতিটি কেন্দ্রে কমপক্ষে ২ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্ব পালন করবে।

ক্যাম্পেইন দিবসেই ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো হবে। তবে দুর্গম এলাকা  হিসাবে চিহ্নিত ১২টি জেলার ৪৬টি উপজেলার ২৪০টি ইউনিয়নে ক্যাম্পেইন পরবর্তী ৪ দিন (১০-১৩ ফেব্রুয়ারি) বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের সার্চিং কার্যক্রম পরিচালনা করে বাদ পড়া শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। শিশুদের ভরাপেটে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। কাঁচি দিয়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মুখ কেটে এর ভিতরে থাকা সবটুকু তরল ওষুধ চিপে খাওয়ানো হবে। জোর করে বা কান্নারত অবস্থায় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো যাবে না। ৬ মাসের কম বয়সী, ৫ বছরের বেশি বয়সী এবং অসুস্থ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো যাবে না।