কে এই হারকিউলিস, প্রশ্ন বিদেশি গণমাধ্যমেও?

নারীর প্রতি ধর্ষণ নামের পাশবিকতার অত্যাচার চলছে প্রতিদিন। ‘ধর্ষণ’ শব্দটি এখন দেশের প্রতিটি পরিবারের কাছে আতঙ্ক। বিগত কিছুদিন ধরে অভিনব কায়দাতে ধর্ষণ বা গণধর্ষণের খবর আসছে গণমাধ্যমে। গত কয়েক দিনে গণমাধ্যমে নতুন আর এক খবর আসছে। ধর্ষণে অভিযুক্ত আসামিদের মৃত্যুর খবর। রাজধানীর অদূরে সাভার থেকে শুরু করে ঝালকাঠির ভাণ্ডারিয়া। ধর্ষণের অভিযোগে এখন পর্যন্ত নিহত তিনজন, হত্যা করা হয়েছে একই কায়দায়।

গ্রিক পুরানের বীর হারকিউলিসের নাম ব্যবহার করে বাংলাদেশে সন্দেহভাজন ধর্ষকদের হত্যার ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন, কে এই হারকিউলিস; যারা ধর্ষকদের হত্যার পর গলায় চিরকুট ঝুলিয়ে রাখছে। যেখানে লেখা হচ্ছে, ‘ধর্ষকের পরিণতি ইহাই। ধর্ষকেরা সাবধান- হারকিউলিস।’

এতদিন প্রশ্ন ছিল, নতুন এই কায়দায় হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে কে বা কারা? প্রথম দুই হত্যাকাণ্ডে কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি।বাংলাদেশে হঠাৎ ধর্ষকদের হত্যায় হারকিউলিসের উত্থান নিয়ে জনমনে যখন প্রশ্ন; ঠিক সেই সময় দেশের বাইরের গণমাধ্যমেও আলোচিত হচ্ছে হারকিউলিস নিয়ে। পুলিশ এই হারকিউলিসের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাচ্ছে না। তবে এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে।

সাভারে নিহত রিপনের লাশের সঙ্গে পাওয়া চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমি ধর্ষণ মামলার মূলহোতা।’ অপরদিকে ঝালকাঠিতে নিহত সজলের লাশের সঙ্গে থাকা চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমার নাম সজল। আমি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার রহিমার (ছদ্মনাম) ধর্ষক। ইহাই আমার পরিণতি।’

প্রথম দুই হত্যাকাণ্ডে হত্যাকারীর পরিচয় পাওয়া না গেলেও তৃতীয় হত্যাকাণ্ডে ধর্ষকদের সাবধান করে এ বিষয়ে ক্লু দেয়া হয়েছে। ঝালকাঠিতে পাওয়া তৃতীয় মরদেহের বুকে লেখা ছিল, ‘আমি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার রহিমার (ছদ্মনাম) ধর্ষক রাকিব। ধর্ষণের পরিণতি ইহাই। ধর্ষকরা সাবধান। হারকিউলিস।’

তৃতীয় চিরকুটে পাওয়া ক্লু’তে দেখা যায় হত্যাকারীর নাম হারকিউলিস। আসলে এটা হত্যাকারীর নাম নয়, বরং ক্লু। কারণ, গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী হারকিউলিস ছিলেন গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর। আর ধর্ষণে অভিযুক্তদের হত্যাকারী আসলে এই হারকিউলিসের কর্মকাণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত।

ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, হারকিউলিসের নামে অভিযুক্ত সিরিয়াল কিলার বাংলাদেশের পুলিশকে ব্যস্ত রেখেছে। গত দুই সপ্তাহে দেশটিতে অন্তত তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে; যাদের সবাই অভিযুক্ত ধর্ষক। এই ধর্ষকদের হত্যার পর তাদের গলায় চিরকুট লিখে রেখেছে।

শুক্রবার রাজাপুরে একটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। যার গলায় কাগজে লেখা ছিল, ‘আমি রাকিব, আমি ভাণ্ডারিয়ার মাদরাসা ছাত্রীর… ধর্ষক। ইহাই একজন ধর্ষকের পরিণতি। ধর্ষকরা সাবধান…হারকিউলিস।’

নিহত যুবকের নাম রাকিব হোসাইন (২০)। ভাণ্ডারিয়ায় মাদরাসা ছাত্রীকে গণধর্ষণের মামলার আসামি ছিলেন তিনি। নিহত রাকিবের মাথায় গুলির চিহ্ন রয়েছে বলে রাজাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন।

ভারতীয় অপর প্রভাবশালী দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ‘বাংলাদেশে গণর্ধষণে অভিযুক্তদের হত্যা করছে হারকিউলিস; তিনজন খুন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত তিন ধর্ষককে হত্যার পর গলায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে চিরকুট।

ভাণ্ডারিয়ায় সন্দেহভাজন ধর্ষক রাকিকে হত্যার পর তার গলায় চিরকুটে ধর্ষণের পরিণতি এটাই বলে লিখে রাখা হয়েছে। এনিয়ে দেশটিতে তিনজন ধর্ষকের মরদেহ উদ্ধার করলো পুলিশ; যাদের গলায় চিরকুট ঝোলানো ছিল।

এর আগে গত ৩৬ জানুয়ারি পুলিশ ঝালকাঠির বোলতলায় সজল জমাদ্দার নামে এক ধর্ষকের মরদেহ ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করে। তার গলায়ও চিরকুটে লেখা ছিল, আমি সজল। আমি …এর ধর্ষক। এটাই আমার শাস্তি। সজল এবং রাকিব দু’জনই একই ধর্ষণ মামলার আসামি ছিলেন।

গত ১৮ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকার অদূরে সাভারের আমিন মডেল টাউনে রিপন নামে একজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলায়ও চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমি একটি ধর্ষণ মামলার প্রধান সন্দেহভাজন।’ গার্মেন্টসের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে গণধর্ষণের মূলহোতা ছিলে রিপন। ধর্ষণের শিকার ওই গার্মেন্টস কর্মী ৮ জানুয়ারি মারা যান।

‘বিডি হারকিউলিস’দের থামানোর উপায় কী?

মানবাধিকারের কথা যতই বলা হোক না কেন, এটাও স্বীকার করতে হবে যে যারা এ হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করছে তারা একটা বার্তা দিতে চাচ্ছে যা সমাজের জন্য খুবই ইতিবাচক। হত্যাকাণ্ড কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য না হলেও এ ঘটনায় ধর্ষকদের কাছে বার্তা যাচ্ছে যে, এতদিন আইনের মারপ্যাঁচে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা হলেও এখন থেকে কেউ যদি ধর্ষণ করো তাহলে পরিণতিটা নির্মম হত্যাকাণ্ডেই হবে।

এটা ঠিক যে, রাষ্ট্রের ভেতর কোনো হত্যাকাণ্ড হলে তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। এখন এই হারকিউলিসদের থামাতে উদ্যোগ নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। এজন্য যা করতে হবে তা হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা। ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধের দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তাহলেই আর কারও কথিত হারকিউলিস হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে হবে না। রাষ্ট্র কি এই চিন্তা করছে নাকি অন্যকিছু? নাকি আসলে কিছুই ভাবছে না?

এ বিষয়ে এখনই কিছু না ভাবলে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ মানুষের যে সমর্থন পাচ্ছে এই ‘হারকিউলিস’, তাতে সামনে ভয়াবহ অশনি সংকেতের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।