সরকারের এই মেয়াদেই শুরু হবে পাতাল রেল প্রকল্পের কাজ

নির্বাচনে জয়লাভের পর বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এর মধ্যে একটি হল পাতাল রেল প্রকল্প। পাতাল রেলের পরিকল্পনা আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এবার সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এবং সেটি হবে এই সরকারের আমলেই।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। তারা জানাচ্ছেন, সরকারের এই মেয়াদেই পাতাল রেল প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার রাজধানীতে পাতাল রেল স্থাপনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকারে আনতে যাচ্ছে।  স্বপ্নের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘সবুজ সংকেত’ দেওয়া হয়েছে। এই সরকারের মেয়াদে ঢাকায় অন্তত দুটি পাতাল রেল রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ভিত্তিতে ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ টঙ্গী ও আমিনবাজার থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় রুট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ রুট দুটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় হতে পারে প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সূত্রগুলো জানায়, পদ্মা সেতু, ঢাকায় মেট্রোরেল এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় বড় প্রকল্প এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা। এই বাস্তবতা থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন রাজধানীতে পাতাল রেল স্থাপনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। নির্বাচনের আগে গত ডিসেম্বরে রাজধানীর গুলশানে একটি নির্বাচনী জনসভায়ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাতাল রেল সেবা চালুর প্রতিশ্রুতি দেন। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এলে রাজধানীর বিরক্তিকর যানজট দূর করতে তারা পাতাল রেল সেবা চালু করবেন। পাতাল রেলের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অর্থায়নের বিষয়েও প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। রাজধানীর যানজট নিরসনে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন করতে আগ্রহী। পাতাল রেলের জন্য সাবওয়ে স্থাপিত হলে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০ মিটার নিচ দিয়ে চলবে যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে মহানগরীর প্রায় ৪০ লাখ যাত্রী পরিবহন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাজধানীর সাধারণ মানুষকে যানজট থেকে মুক্তি দিতে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারে রয়েছে পাতাল রেল চালুর বিষয়টি। পাতাল রেল সেবার জন্য সরকার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শুরু করেছে। তিনি জানান, এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও ঢাকা শহরজুড়ে পাতাল রেল সেবা চালুর বিষয়টি এখন পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে। পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, পাতাল রেলের সাবওয়ে নির্মিত হলে জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ মাটির নিচ দিয়ে চলাচল করতে পারবে। এতে মাটির ওপরে রাস্তায় মানুষের চলাচল কমবে। বাড়বে ফাঁকা জায়গা। দূর হবে যানজট।

জানা গেছে, গত জুলাইয়ে ঢাকায় পাতাল রেল (সাবওয়ে) নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অনুমোদন দেয় সরকার। স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠান টিপসা এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকায় চারটি পাতাল রেল রুট নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করবে ওই প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকায় চারটি সাবওয়ে রুট নির্ধারণ করে সমীক্ষা কাজ চলবে। এ বিষয়ে টিপসার সঙ্গে সেতু বিভাগের চুক্তি হয়েছে গত বছর আগস্টে। চুক্তি অনুযায়ী ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে প্রথম যে রুটটি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বাছাই করা হয়েছে, সেটি হবে এ রকম- টঙ্গী থেকে শুরু করে এয়ারপোর্ট-কাকলী-মহাখালী-মগবাজার-পল্টন-শাপলা চত্বর হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত, যা পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। এটির জন্য সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অপরদিকে ১৬ কিলোমিটার সাবওয়ে লাইন-২ হবে- আমিনবাজার থেকে শুরু করে গাবতলী-শ্যামলী-আসাদগেট-নিউমার্কেট-টিএসসি-ইত্তেফাক হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে উভয় দিকে এটি সম্প্রসারিত হবে। এর সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ছাড়া রুট-৩-এর অধীনে গাবতলী থেকে মিরপুর-১ মিরপুর-১০ কাকলী-গুলশান-২ নতুনবাজার-রামপুরা টিভি স্টেশন-খিলক্ষেত-শাপলা চত্বর-জগন্নাথ হল হয়ে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত সমীক্ষা চলবে। রুট-৪-এর আওতায় রামপুরা টিভি স্টেশন থেকে নিকেতন-তেজগাঁও-সোনারগাঁও হোটেল-পান্থপথ-ধানমন্ডি-২৭ জিগাতলা-আজিমপুর-লালবাগ হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত পাতাল রেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। রুট-৩ ও রুট-৪-এর দৈর্ঘ্য চূড়ান্ত হয়নি।  সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মাটির ২০ থেকে ৪০ মিটার গভীরে পাতাল রেলপথ নির্মাণ করা হবে। অত্যাধুনিক টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) ব্যবহার করা হবে এ কাজে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় জনদুর্ভোগ হবে না। মাটির ওপরে খোঁড়াখুঁড়ি করতে হবে না। কর্মকর্তারা জানান, উড়ালসড়ক, ফ্লাইওভারের সম্ভাব্য আয়ুকাল ৫০ থেকে ৭৫ বছর। পাতাল রেলের আয়ুকাল ১০০ থেকে ১২৫ বছর। লন্ডনের শতবর্ষী পাতাল রেল এখনো সচল রয়েছে। যানজট নিরসনে লন্ডন ছাড়াও নিউইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকো, বাগোটার মতো শহরে উড়ালসড়ক, ফ্লাইওভার, ভায়াডাক্ট অপসারণ করে সাবওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুসারে আমরা পাতাল রেল নির্মাণের বিষয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছি।’ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঢাকায় পাতাল রেল (সাবওয়ে) নির্মাণ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এরই মধ্যে শুরু করেছে স্প্যানিশ কোম্পানি টিপসা। গত মাসে আমরা এর ওপর সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেছি। বিভিন্ন সংস্থা যেমন বিআরটিএ, এমআরটির সঙ্গে আলোচনা চলছে প্রকল্পের সমন্বয় নিয়ে। কারণ রাজধানীতে যে মেট্রোরেল হচ্ছে, আমরা চাইছি পাতাল রেলের স্টেশনগুলো যেন তার কাছাকাছি থাকে, যাতে করে মানুষ পাতাল রেল থেকে মেট্রোরেলে আবার মেট্রোরেল থেকে সহজেই পাতাল রেল স্টেশনে যাতায়াত করতে পারে। সরকারের এই মেয়াদেই যাতে কাজ শুরু করতে পারি সে জন্য আমরা দ্রুত এসব সমন্বয়ের কাজ শেষ করব।’ ঢাকা মহানগরীতে সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা প্রকল্পটি সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতাধীন একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প ছিল। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য প্রফেসর শামসুল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ উন্নত দেশ হবে, সেখানে পাতাল রেল থাকবে না সেটি হয় না। তিনি বলেন, ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় আমরা পাতাল রেলের সম্ভাব্যতা যাচাইকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম; এবার অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫) পাতাল রেলপথ নির্মাণের বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’ পঞ্চবার্ষিকীর অগ্রাধিকার অনুযায়ী এ সরকারের মেয়াদেই ঢাকায় পাতাল রেল সেবা চালু হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।