পুলিশের নথিতেই অশান্ত বগুড়া, দৃশ্যমান হয়নি কোন সংঘাতের চিত্র

আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশের নথিতে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর কার্যত এই চার মাস অশান্ত ছিল বগুড়া। জেলায় ৩৫টি ককটেল হামলা, গাড়ি পোড়ানো, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর ওপর হামলা, দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও গাড়িতে পেট্রল বোমা হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় নাশকতার মামলাও হয়েছে ৩৫টি। মামলার বাদী পুলিশ, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং জোটের মিত্ররা। আর আসামি বিএনপির প্রায় সাড়ে ৯ হাজার নেতাকর্মী। এরমধ্যে ৮ হাজার ৩০০ জনই অজ্ঞাতনামা।

পুলিশের নথিতে বগুড়া অশান্ত হলেও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মামলায় বা পুলিশের নথিতে যে স্থানটি অশান্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে কোনো গোলযোগ বা সংঘাতের চিত্র তাদের চোখে পড়েনি। তবে দু’একটি স্থানে সংঘাতের কথা স্বীকার করেন স্থানীয়রা।

তবে পুলিশের নথি থেকে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ১২ থেকে ২২ ডিসেম্বর ১০ দিন। এই সময়ে ৬ থানায় ১৩টি মামলা হয়েছে। এখন চলছে পুলিশের ধরপাকড়। গা ঢাকা দিয়েছেন ধানের শীষের কর্মী-সমর্থকরা। এসব মামলায় বিএনপির ৭৬৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাত আসামি ৭ হাজার ৩৬১ জন।আসামি গ্রেফতারে পুলিশের বিশেষ অভিযান এখনো চলছে। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলেও গ্রেফতার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ধানের শীষের কর্মী-সমর্থকেরা।

তফসিল ঘোষণার পর সোনাতলা থানায় ছয়টি, সারিয়াকান্দি ও শিবগঞ্জ থানায় দুটি করে, বগুড়া সদর, নন্দীগ্রাম এবং ধুনট থানায় একটি করে ঘটনা ঘটে। আর তফসিল ঘোষণার আগে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর দুই মাসে বগুড়ার বিভিন্ন থানায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টি মামলা হয়। বিএনপির নেতাকর্মীদের দাবি এগুলোর সবই গায়েবি মামলা। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ৫২৯ জন। অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা আরও পাঁচ শতাধিক। এরমধ্যে সদর থানায় ৫, শাজাহানপুরে ৩, সোনাতলা, গাবতলী, কাহালু, নন্দীগ্রাম ও সারিয়াকান্দি উপজেলায় দুটি করে ১০টি এবং শিবগঞ্জ, দুপচাঁচিয়া, শেরপুর ও ধুনট থানায় একটি করে চারটি মামলা হয়।

সর্বশেষ বগুড়া- ৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে ২২ ডিসেম্বর মহাজোট সমর্থিত জাসদের প্রার্থী একেএম রেজাউল করিম তানসেনের নৌকার প্রচারণা শেষে ফেরার পথে নন্দীগ্রাম উপজেলার কাথম এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর গাড়িবহরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ এনে বিএনপির ৬১ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শনিবার নন্দীগ্রামের থানায় মামলা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি ৩৩ জন। মামলার বাদী আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম।

কিন্তু সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ঘটনার স্থান নন্দীগ্রাম উপজেলার কাথম এলাকার কালিগঞ্জ সড়কের নামুইট ও টাকুইর মোড়ের মাঝখানে। সড়কের উপর হালকা কালির দাগ রয়েছে। ছোট ছোট কয়েকটি কাঁচের টুকরাও দেখা গেছে। তবে এলাকার লোকজন জানে না হামলা সম্পর্কে।

বগুড়া জেলা বিএনপির সম্পাদক জয়নাল আবেদীন অভিযোগ করেন, হামলা-মামলা করে বিএনপির নেতাকর্মীশূন্য করা হচ্ছে নির্বাচনী মাঠ। হামলা হচ্ছে ধানের শীষের প্রার্থীদের ওপরও। এসব ঘটনায় প্রশাসন-পুলিশে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার তারা পাননি।

ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০০ মিটার পশ্চিমে নামুইট গ্রামের ১০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন সে রাতে কী হয়েছিল এ বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। হামলার কোনো শব্দ তারা শোনেননি। কোনো মিছিলের কথাও কেউ বলতে পারছেন না। কিন্তু সকালে উঠে জানতে পারেন রাতে সড়কের উপর মোটরসাইকেল পোড়ানো হয়েছে।

মামলার প্রধান আসামি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) অধ্যাপক ড. হাসনাত আলী বলেন, এজাহারে ঘটনার যে সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ওই দিন তিনি সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অফিস করেছেন। সাড়ে ৭টা থেকে ৭টা পর্যন্ত একটি জাতীয় দৈনিকের রাজশাহী কার্যালয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাড়ে ৮টায় ক্রেটিড কার্ড দিয়ে রাজশাহীর একটি শপিং সেন্টারে কেনাকাটা করেছেন।

এরকম চিত্র প্রায় সব মামলার ঘটনাস্থলেই। তফসিল ঘোষনার আগে বিভিন্ন থানায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ২২টি মামলার আসামি গ্রেফতারে ধরপাকড় করছে পুলিশ। এজাহারে নাম না থাকলেও বিএনপির নেতাকর্মীদের আটকের পর এসব মামলায় গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। এসব মামলায় নিরীহ লোকজনকে ফাঁসানোর অভিযোগও রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত করেই মামলা গ্রহণ করছে। কেউ জড়িত না থাকলে তদন্তে অব্যাহতি দেয়া হবে। পুলিশের কাছে কেউ এজাহার নিয়ে এলে তা না নেয়ার উপায় নেই। এখন পর্যন্ত বিএনপি কোনো অভিযোগই দেয়নি। ঢালাওভাবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।