বিতর্কের জন্ম দিল ইসির জারি করা সাংবাদিক নীতিমালা!

নির্বাচন উপলক্ষে ইসির জারি করা সাংবাদিক নীতিমালা এরই মধ্যে বিতর্কের তৈরি করেছে। আসন্ন নির্বাচনের কোনো অনিয়ম, ত্রুটি-বিচ্যুতি বা গোলযোগ হলে সাংবাদিকেরা যাতে তা প্রকাশ করতে না পারেন, নীতিমালাটি তৈরির পেছনে সেই উদ্দেশ্যই কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়ে ইতিমধ্যে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার উপর আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি সাংবাদিক নীতিমালা করেছে। এই নীতিমালায় সাংবাদিকেরা নির্বাচনের দিন কী কী করতে পারবেন, আর কী করতে পারবেন না, তার একটি লম্বা তালিকা দেওয়া হয়েছে। আর এই নীতিমালার তালিকা বিতর্কের তৈরি করেছে। নীতিমালার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় বাঁধা এসেছে সাংবাদিকদের চলাচলের ওপর। সাংবাদিকেরা যাতে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে দ্রুত পৌঁছাতে না পারেন, তার একটা ব্যবস্থাই নীতিমালার মাধ্যমে করা হয়েছে।

ইসি বলেছে, মোটরসাইকেলের জন্য কোনো স্টিকার দেওয়া হবে না। ফলে গণমাধ্যমকর্মীরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে নির্বাচনের দিনে সংবাদ সংগ্রহ করতে পারছেন না। নির্বাচনের দিন সংবাদ সংগ্রহে মোটরসাইকেলের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এর আগের সব নির্বাচনেই দ্রুত যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। স্টিকারযুক্ত মোটরসাইকেলের অপব্যবহারের কোনো অভিযোগও কখনো ওঠেনি। বরং দ্রুত তথ্য সংগ্রহের জন্য এই যানটিই সবচেয়ে কার্যকরী। ২০০৮ সালে শেষ সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল। সে সময়সহ কখনোই মোটরসাইকেলে চলাচলের স্টিকার না দেওয়ার কথা বলা ছিল না। কিন্তু এবার ইসির মূল লক্ষ্যই হচ্ছে, গণমাধ্যমকর্মীরা যাতে কোনো ভাবেই মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে না পারেন।

এছাড়া নির্ধারিত সময়ে ভিসা না দেওয়ায় এবার বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সবচেয়ে বড় দলটি আসছে না। নানা বিধিনিষেধের কারণে দেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যাও কম। এর মধ্যেই গণমাধ্যমকর্মীদের চলাচল সীমিত করার কাজটি করল ইসি। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে কি না, কোথাও অনিয়ম হলে, জাল ভোট দেওয়ার খবর পেলে, সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থলে দ্রুত ছুটে যাওয়ার উপায় থাকছে না। আবার নীতিমালা বলা আছে, একাধিক গণমাধ্যমকর্মীকে একসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেওয়া হবে না। এতে করেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থেকে যাবে ওই গণমাধ্যমকর্মীর।

চলতি বছরে বর্তমান ইসির অধীনে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়েছে। সব কটি নির্বাচনই কমবেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের বড় উদাহরণ এসব নির্বাচন। এমনকি ব্যাপক অনিয়মের কারণে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন মাঝপথে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও ইসি যে সরে এসেছিল, তা নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নিজেই প্রকাশ করেছেন।

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, গত পাঁচ সিটি নির্বাচনের খবর সংগ্রহ করতে নানা ধরনের বাঁধার মুখে পড়েছিলেন গণমাধ্যমকর্মীরা। আর সবচেয়ে বড় বাঁধাটি এসেছিল মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে। খবর সংগ্রহে সহায়তা করেননি নির্বাচনী কর্মকর্তারাও। আর ভোট কেন্দ্রের বাইরে তো সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের আগ্রাসী আচরণ ছিলই। সব মিলিয়ে সিটি নির্বাচনগুলোতে সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো কিছু ছিল না। আর ইসির মনোভাবও অনুকূল ছিল না। বরং মনে হয়েছে, ভোট কেন্দ্র থেকে সাংবাদিকদের দূরে রাখাটাই যেন তাদের উদ্দেশ্য।

এমনিতেই কোনো অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করলে তা অস্বীকারের একটি প্রবণতা সব সরকারি মহলেই দেখা যায়। ফলে প্রমাণসহ অনিয়মের তথ্য প্রচার করতে হয়। অথচ ইসি এমন ব্যবস্থা করছে, যাতে প্রমাণ পাওয়ার সুযোগটিই না থাকে। দেশে এমন অনেক অঞ্চল আছে, যেখানে বড় যানবাহন চলাচলের মতো উপযোগী রাস্তা থাকে না। সেসব জায়গায় একমাত্র ভরসা হেঁটে যাওয়া বা মোটরসাইকেল। এ কারণে ইসির নীতিমালার বিরোধিতা সবচেয়ে বেশি এসেছে ঢাকার বাইরে থেকে।

খুলনার মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (এমইউজে) গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে সাংবাদিক নীতিমালা প্রত্যাহার চেয়েছে। বান্দরবান জেলা পাহাড়ি এলাকা। এসব এলাকায় মোটরসাইকেল ছাড়া যাতায়াত আরও কঠিন। গতকাল সেখানকার সাংবাদিকেরাও একই দাবি করেছেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশের নেতারা এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইসির নীতিমালা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী।

প্রসঙ্গত, নির্বাচন বিষয়ে সাংবাদিকদের সংগঠন রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি) মোটরসাইকেলের অনুকূলে স্টিকার বরাদ্দের দাবি জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে গতকাল একটি চিঠিও দিয়েছে।