না ফেরার দেশে খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেন

খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেন আর নেই। শুক্রবার (১৪ ডিসেম্বর) দুপুরে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৫৭ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। জীবনের শেষ লগ্নে আমজাদ হোসেনের পাশে ছিলেন তার ছোট ছেলে নির্মাতা ও অভিনেতা সোহেল আরমান। ওই হাসপাতালে এখন আনুষ্ঠানিকতার বিষয়ও দেখতে হচ্ছে শোকাহত আরমানকে।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ায় কিছুদিন আগে ঢাকার তেজগাঁওয়ের ইমপালস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল আমজাদ হোসেনকে। হাসপাতালে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখাহয়েছিল। দেশের বরেণ্য এই নির্মাতার শারীরিক অসুস্থতার খবর শুনে হাসপাতালে ভর্তির তিন দিনের মাথায় তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্যাংকক থেকে সোহেল আরমান বলেন, ‘বাবা যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছিলেন তখন আমি তার পাশেই ছিলাম। ঠিক দুপুর ৩টার ৫৭ মিনিটে (ব্যাংকক সময়) বাবা আমাদের একা করে চলে গেলেন। এখানে পরিবার থেকে একমাত্র আমিই আছি।’

‘মরদেহ দেশের নেওয়ার জন্য অনেক ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। নানা রকম আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হচ্ছে। বাবার সম্মান রক্ষার্থে যা যা করা লাগে সব করছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করছে। এখন আর কিছু বলার শক্তি পাচ্ছি না। শুধু সবাইকে বলবো বাবার মাগফেরাতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে।’

১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) জামালপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আমজাদ হোসেন।

ব্যতিক্রমধর্মী এই চলচ্চিত্র নির্মাতা তাঁর কর্মজীবনে ১২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ৬টি বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেছেন। সাবিনা ইয়াসমিনের (১৩টি) পর তিনি সর্বাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী। এছাড়া তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন এবং এক আয়োজনে পাঁচটি বিভাগে (গোলাপী এখন ট্রেনে চলচ্চিত্রের জন্য) জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

তিনি ১৯৬১ সালে তোমার আমার চলচ্চিত্রে অভিনয় দিয়ে চলচ্চিত্রে আগমন করেন। একই বছর মুস্তাফিজ পরিচালিত হারানো দিন ছবিতে অভিনয় করেন। পরিচালক সালাহ্‌উদ্দিন তাঁর রচিত নাটক ধারাপাত অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ধারাপাত তাঁর রচিত প্রথম চলচ্চিত্র এবং তিনি এই চলচ্চিত্রে একটি প্রধান চরিত্রে অভিনয়ও করেন। পরবর্তীকালে তিনি জহির রায়হানের দলে যোগ দেন ও তার সহকারী হিসেবে কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করেন।

তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল লোককাহিনী নির্ভর বেহুলা (১৯৬৬)। ১৯৬২ সালে ছবিটির কাজ শুরু হয়। তিনি এই ছবির সংলাপ রচনা করেন এবং এতে অভিনয় করেন। এই ছবিতে কাজ করতে গিয়ে অভিনেতা রাজ্জাকের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব হয়, যে সম্পর্ক রাজ্জাকের মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এছাড়া পরের বছর তিনি জহির রায়হানের আনোয়ারা (১৯৬৭) চলচ্চিত্রেও রাজ্জাকের সাথে অভিনয় করেন। পরে চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র আগুন নিয়ে খেলা (১৯৬৭)। শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করে।

এছাড়া সাহিত্য রচনার জন্য তিনি ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে দুইবার অগ্রণী শিশু সাহিত্য পুরস্কার ও ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ একাধিক পুরস্কার লাভ করেন।

আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় নির্মিত জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাল্যবন্ধু, পিতা পুত্র, এই নিয়ে পৃথিবী, বাংলার মুখ, নয়নমণি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, জন্ম থেকে জ্বলছি, দুই পয়সার আলতা, সখিনার যুদ্ধ, ভাত দে, হীরামতি, প্রাণের মানুষ, কাল সকালে, গোলাপী এখন ঢাকায়, গোলাপী এখন বিলেতে ইত্যাদি