নির্বাচনের সাথে ইসির প্রতি ভারী হয়ে আসছে বিএনপির অভিযোগ

বুধবার সকালে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ করে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতো ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিএনপির অভিযোগের পালা ততোটাই ভারী হয়ে আসছে।

তিনি বলেন, আরেকটি পাতানো নির্বাচনের পথে হাঁটছে কমিশন। এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ার জন্য প্রধান দায়ী নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসন।

‘নখ-দন্তহীন কমিশন’ বলে নির্বাচন কমিশনকে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পুরো দায়িত্ব পুলিশ বাহিনীর উপর অর্পন করেছে হুদা কমিশন। প্রায় সাড়ে ৬ লাখ নির্বাচনী কর্মকর্তার অধিকাংশই আওয়ামী লীগের দলীয় লোকদের বাছাই করে তালিকা প্রস্তুত করছে পুলিশ। ইতিমধ্যে সারাদেশে ৪১ হাজার প্রিজাইডিং অফিসারের তালিকা পুলিশ প্রস্তুত করে ফেলেছে। এখন দুই লাখ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও চার লাখ পোলিং অফিসারের তালিকাও প্রস্তুত করার দায়িত্ব পুলিশই পালন করছে। পুলিশের প্রস্তুত করা তালিকা শুধুমাত্র চূড়ান্ত করার পথে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। পুলিশ যে তালিকা প্রস্তুত করছে বা করেছে তার যথেষ্ট প্রমানাদি রয়েছে আমাদের কাছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও অনলাইনে পুলিশ কর্তৃক নির্বাচনী কর্মকর্তাদের তালিকা প্রস্তুত করার খবর বড় করে প্রকাশিত হলে নখ-দন্তহীন কমিশন রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে।

‘দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, জনগণের ভোটারাধিকার আবার হরণ করার জন্য নতুন চক্রান্তে মেতেছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন’ যোগ করেন রিজভী।

সমতল নির্বাচনী মাঠ তৈরীর স্বার্থে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সরকারী বাসভবন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সন্তান যিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত একজন প্রার্থী। তার নেতৃত্বে কিভাবে সরকারী বাসভবন বঙ্গভবনে আওয়ামী লীগের সভা ও আপ্যায়নের আয়োজন চলে ? মহামান্য রাষ্ট্রপতি একজন বিজ্ঞ ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্ব হওয়ার পরও কিভাবে তাঁর বাসভবন বঙ্গভবনকে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করা হলো ? এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান রিজভী আহমেদ।

২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনে পুলিশ বেপরোয়া কর্মকান্ড করেছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, বিশেষ করে খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে পুলিশ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের পর রাজশাহী ও বরিশালে জঘন্য নির্বাচন করেছে এই কমিশন। পুলিশ নিজেরাই ব্যালটে সিল মেরেছে। পোলিং এজেন্ট ও সাংবাদিকদেরকে কেন্দ্রেই মারধর করা হয়েছে। বরিশালেই বর্তমান কমিশনের তদন্তে ৫৭টি ভোট কেন্দ্রেই অনিয়ম হয়েছে বলে গনমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু বিগত বিতর্কিত ও অনিয়মে ভরপুর সিটি নির্বাচনগুলো তারা বাতিল করেনি। বরং ক্ষমতাসীনদের একের পর এক অনিয়ম করতে উৎসাহিত করেছে নির্বাচন কমিশন। সাংবিধান প্রদত্ত সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পালনে তারা পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এখন বিরলতম প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে, যারা নিজেরা নিজেদের স্বাধীনতাকে অন্যের হাতে বিসর্জন দেয়।

বিএনপির এই নেতা আরো অভিযোগ করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুলনায় সম্ভাব্য নির্বাচনী কর্মকর্তাদের তালিকা করেছে খুলনার হরিণটানা থানা পুলিশ। তালিকা প্রস্তুত করার আগে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকারবিরোধী কেউ থাকলে পুলিশের তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়া হয়েছে। সেই তালিকায় দেখা গেছে, চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭৪ জন শিক্ষকের নাম। এদের ভেতরে ৬৩ জন বা ৮৫ শতাংশই আওয়ামী লীগ সমর্থক। একইভাবে সারাদেশে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। পুলিশের প্রস্তুত করা তালিকা পরবর্তিতে গণমাধ্যমকে সরবরাহ করা হবে।

রিজভী বলেন, নির্বাচনী তফশীল ঘোষনার পূর্বে যেভাবে প্রশাসন সাজানো হয়েছিল তা সেইভাবেই অক্ষুন্ন আছে। আওয়ামী লীগের দলবাজ কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। এখন পর্যন্ত কোন এসপি, ডিসি, ইউএনও বা ওসিকে বদলি করেনি নির্বাচন কমিশন। বরং তফশীল ঘোষনর পর বদলি বা পদায়নে কমিশনের মতামত লাগবে, অথচ এখনও সরকারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচন উপলক্ষে সরকারের সাজানো পুলিশ বাহিনীতে যাতে কোন ধরণের পরিবর্তন বা বদলি করা না হয়, সেজন্য গত সোমবার দুপুরে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে সরকারের অনুগত একদল পুলিশ কর্মকর্তা বৈঠক করে এসেছেন।

অথচ সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে অগাধ ক্ষমতা দেয়া হলেও ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ কমিশন সেই ক্ষমতার প্রয়োগ না করে সংবিধান লংঘন করছে। সরকারকে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় আনার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে নির্বাচন কমিশন।