সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনঃ এইচআরডব্লিউ

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। আইনটি বাক-স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করেছেন মানবাধিকার সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস।

গতকাল মঙ্গলবার দেয়া এক প্রতিবেদনে সংগঠনটি সাংবাদিকদের ঘোর বিরোধীতা সত্ত্বেও পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সমালোচনা করে। সেসময় সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন- “দেশের সাংবাদিকদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও গত সপ্তাহে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য বড় আঘাত। এই আইন অপব্যবহার করার জন্য উপযুক্ত একটি অস্ত্র এবং মুক্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তজার্তিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের যে বাধ্যবাধকতা আছে তার পরিষ্কার লঙ্ঘন। এতে কমপক্ষে ৫টি বিধান আছে, কী ধরনের মতপ্রকাশ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে তা পরিস্কার করে বলা হয় নি। সমালোচকদের কণ্ঠ দমন করাটাকে বৈধতা দেয়ার জন্যই এই আইন। এই আইন হচ্ছে সমালোচনামূলক বক্তব্যের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টির অনুমোদন।” তিনি বলেন, বহুল সমালোচিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি অ্যাক্ট) বেশিরভাগ সমস্যা সৃষ্টিকারী অধ্যায় এখানে রাখা হয়েছে। এর বেশ কিছু অধ্যায় আন্তর্জাতিক মানের মুক্ত মত প্রকাশের অন্তরায় বলেও দাবি করেন ব্র্যাড অ্যাডামস।

বিবৃতিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সেকশন ২১, ২৫(এ), ২৮, ২৯, ৩১, ৩২ নিয়ে আপত্তি তোলেন মানবাধিকার সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক এই পরিচালক। এই আইনের বেশ কিছু ধারায় মুক্ত মত প্রকাশের আন্তর্জাতিক মানদন্ড লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

আইনের ২১ নম্বর সেকশনে, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, যুদ্ধের চেতনা কিংবা জাতির জনকের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা’ ছড়ালে ১৪ বছর পর্যন্ত জেলের বিধান রাখা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)-এর সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এর পর্যবেক্ষক জাতিসংঘের শাখা ইউনাইটেড নেশনস হিউম্যান রাইটস কমিটি বলেছে, ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করলে শাস্তি দেয়ার বিধান কোন ভাবেই মনোভাব ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সম্মান দেয়ার প্রতি দায়ত্বশীল একটি রাষ্ট্রের জন্য কোনভাবেই সঙ্গত নয়।

এছাড়া ২৫(ক) সেকশনে ‘আগ্রাসী ও ভীতিকর’ (অ্যাগ্রেসিভ অর ফ্রাইটেনিং) তথ্য প্রকাশ করার অপরাধে তিন বছর পর্যন্ত জেলের বিধান রাখা হয়েছে। এই শব্দ দুটি সম্পর্কে আইনে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয় নি। মত প্রকাশকে সীমাবদ্ধতার যে আইন, সেখানে এটা পরিষ্কার করে বলা উচিত- কোন জাতীয় মত আইন লঙ্ঘন করবে। আইনের এই অস্পষ্ট বিধানের ব্যবহার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি লঙ্ঘন করেছে। এই অস্পষ্টতার সঙ্গে কড়া বড় ধরনের শাস্তির বিধান একসঙ্গে সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ বৃদ্ধি করবে।

ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন বক্তব্যের জন্য ৫ বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে ২৮ নম্বর সেকশনে। এখানেই আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ, যে মত অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এবং এজন্য ফৌজদারি শাস্তির বিধান রাখা যুক্তিযুক্ত নয়।

আইসিটি আইনের নিষ্পেষণমুলক ধারা ৫৭-এর মতোই এই আইনের ২৯ নম্বর সেকশন। এখানে অনলাইনে মানহানিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আইসিটি ধারার মতো নয়, ২৯ নম্বর সেকশনে ওই সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানহানির অভিযোগ সীমাবদ্ধ করা হয়েছে যারা দন্ডবিধির ক্রিমিনাল মানহানির পর্যায়ে পড়েন। মানহানিকে একটি সিভিল বিষয় হিসেবে দেখা উচিত। একে জেল দিয়ে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে অথবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে অথবা বিশৃংখলা সৃষ্টি করে অথবা বিঘ্ন সৃষ্টি করে অথবা আইন শৃংখলা পরিস্থিতির বিঘ্ন ঘটায় এমন তথ্য পোস্ট করার কারণে ১০ বছর পর্যন্ত জেলের বিধান রয়েছে ৩১ নম্বর সেকশনে। তবে সুস্পষ্টভাবে এতে বলা নেই যে, কোন জাতীয় বক্তব্য বা মত আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে এই ধারা ব্যবহার করে সরকার যে মত বা বক্তব্যকে পছন্দ করবে না, তাদের বিরুদ্ধে বিচারের সুযোগ পাবে। উপরন্ত সরকারের যেকোনো সমালোচনা অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে এবং জনগণের প্রতিবাদের সম্ভাব্যতা থাকে। আইন শৃংখলার ব্যাঘাত ঘটায় শুধু এমন যুক্তির ভিত্তিতে কোনো সমালোচনাকারীকে শাস্তি দেয়া সরকারের উচিত হবে না।

৩২ নম্বর সেকশন নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা এই সেকশন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন। কারণ, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ এই আইন ভঙ্গ করলে তাকে সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া এই আইনে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার ও তল্লাশির ক্ষমতা দেয়া হয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে। এই অধ্যায়ের ঘোরতর বিরোধীতা করে ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, বাংলাদেশের এডিটর্স কাউন্সিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে বলেছে, সংবিধানে গণমাধ্যম ও বাক স্বাধীনতার নিশ্চিতের যে কথা বলা হয়েছে, এই আইন তার বিরোধী হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া বাংলাদেশের সাংবাদিকরা এ আইনের ৩২ নম্বর সেকশনের বিরোধিতা করে আসছেন। এ আইনে সরকার ব্যবহৃত কোনো কম্পিউটার অথবা অন্য কোনো ডিজিটাল ডিভাইসের গোপনীয় তথ্য (ক্লাসিফায়েড ইনফরমেশন) সংগ্রহ করা, হাতবদল করা বা সংরক্ষণ করার জন্য ১৪ বছর পর্যন্ত শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এটা করা হলে অন্যায়ভাবে এটি ব্যবহারের আশংকা থাকে।

নতুন আইনে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এর বলে তারা অনলাইনের তথ্য প্রচারকে বন্ধ করতে পারবে অথবা তা প্রত্যাহার করার ক্ষমতা রাখে। তারা ওয়ারেন্টবিহিন তল্লাশি করতে পারবে এবং জিনিসপত্র জব্দ করতে পারবে। আর তা হবে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বড় আঘাত। এটি সাংবাদিক/সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করবে বলেও দাবি করেন ব্র্যাড।