সবজী হিসেবে বাঁশ কোড়লের ব্যবহার নিয়ন্ত্রনের উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্ট বিভাগের

বছরের চলতি মৌসুম এলেই লামা, আলীকদমসহ পুরো পার্বত্যাঞ্চলে মজাদার সবজী হিসেবে বাশঁ কোড়ল (কচি বাঁশ) ব্যাপক হারে খাওয়া শুরু হয়। এতদাঞ্চলের মানুষের খাদ্য তালিকায় বাঁশ কোড়ল যোগ হয়ে ক্রমেই এর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এক শ্রেনীর অর্থলোভী উপজাতি এবং বাঙ্গালী চলতি মৌসুমে বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ ও বিক্রি করাকে তাদের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

তারা বাঁশ কোড়ল আহরনের নামে নির্বিচারে নিধন করছেন কচি বাঁশ। সবজী হিসেবে বাঁশ কোড়লের এ ব্যবহার নিয়ন্ত্রনে সংশ্লিষ্ট বিভাগ গুলোর কোন উদ্যোগ না থাকায় লামা ও আলীকদমসহ পার্বত্যাঞ্চলে ব্যহত হচ্ছে প্রাকৃতিক ভাবে বাঁশের বংশ বৃদ্ধি।

জানা যায়, লামা ও আলীকদমসহ তিন পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়ে কয়েক প্রজাতির মূল্যবান বাঁশ জন্মে। এ গুলোর মধ্যে রয়েছে মুলি, দুলু, মিটিঙ্গা, কালী ও ছোটিয়া। বর্ষা মৌসুম বিশেষ করে জুন, জুলাই আগস্ট মাসে বাঁশের বংশ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এসময় আস্তে আস্তে বাঁশ বাগান গুলোতে জন্ম নিতে শুরু করে নতুন বাঁশ বা বাঁশ কোড়ল। সাধারণত বাঁশের বংশ বৃদ্ধির সময় বাঁশ আহরন নিষিদ্ধ। অন্যান্য সময়ের তুলনায় নিষিদ্ধ সময়ে বাঁশ আহরন কিছুটা কম হলেও বাঁশ কোড়ল আহরণ থেমে নেই। এ বাঁশ কোড়ল উপজাতিদের খাদ্য তালিকায় মজাদার সবজীর স্থান দখল করে আছে।

উপজাতিদের পাশাপাশি বাঙালিরাও এখন দেদারছে বাঁশ কোড়ল সবজী হিসেবে খেতে শুরু করেছে। সৌখিন ভোজন রসিকদের তৃপ্ত করতে চলতি মৌসুমে পাহাড়ে জন্ম নেয়া কচি বাঁশ পরিণত বাঁশে রুপান্তরীত হওয়ার আগেই বাঁশ কোড়ল হিসেবে বাজারে চলে আসছে। লামা ও আলীকদমসহ তিন পার্বত্য জেলার হাঁট বাজার গুলোতে সাপ্তাহিক হাঁটের দিন প্রকাশ্যে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে বাঁশ কোড়ল। বাঁশ আহরণ বন্ধের মৌসুমে প্রকাশ্যে এভাবে বাঁশ কোড়ল বিক্রির বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রনে সংশ্লিষ্ট বিভাগ গুলোর নিরবতার ফলে প্রতি বছর বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় অর্ধ কোটির বেশি বাঁশ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

উপজেলার গজালিয়া এলাকার হ্লাচিং নু মার্মা সপ্তাহে ২-৩ দিন স্থানীয় গজালিয়া বাজার ও লামা বাজারে বাঁশ কোড়ল বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। তিনি এক থেকে দেড়শ’ বাঁশ কোড়ল বাজারে আনেন। বাঁশ কোড়ল বিক্রেতারা জানান, পূর্বের ন্যায় এখন আর কাছা-কাছি এলাকায় বাঁশ কোড়ল পাওয়া যায়না। দূর্ঘম পাহাড়ের ঘনঝঙ্গল এলাকার বাঁশ বাগান থেকে অনেক পরিশ্রম করে এসকল বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ করতে হয়। প্রতি কেজি বাঁশ কোড়ল ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয় বলে তারা জানান।

আলীকদম বীরমনি তংচংগ্যা পাড়া এলাকার জগদীশ চন্দ্র তংচংগ্যা জানান, বাঁশ কোড়ল একটি মজাদার সবজী। আগে জুম চাষের জন্য পাহাড়ে আগুন দেয়ার পর বৃষ্টি হলেই এক প্রজাতির চিকন বাঁশ জন্মাত। যে গুলো সাধারনত বড় ধরনের কোন কাজে লাগেনা। ওই সকল বাঁশের কোড়ল সংগ্রহ করা হত, যা বেশ মজাদার। বর্তমানে যে সকল বাঁশের কোড়ল সংগ্রহ করা হচ্ছে তাতে বাঁশের বংশ বৃদ্ধি ব্যহত হচ্ছে।

লামা রুপসী পাড়ার শেখ আহমদ জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে দেখে আসছেন তাদের পরিবারে বাশঁ কোড়ল সবজী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কোড়ল সংগ্রহের ফলে বাঁশের বংশ বৃদ্ধি ব্যহত হওয়ার বিষয়টি তারা ভেবে দেখেন নাই।

এক বেসরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবার সপ্তাহে এক বেলা খাবারের সময় ১০ টি বাঁশ কোড়ল খেলে এক মাসে একটি পরিবার ৪০ টি বাঁশ কোড়ল খাদ্য হিসেবে গ্রহন করে। তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসকারি ৫০ হাজার পরিবারও যদি সপ্তাহে এক বেলা হিসেবে নিয়মিত বাঁশ কোড়ল খেয়ে থাকে তা হলে বাঁশের গ্রোয়িং সিজনের ৩ মাসে অর্ধকোটির বেশি বাশ কোড়ল তারা সবজী হিসেবে খাচ্ছে। যা এতদাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে বাঁশের বংশ বৃদ্ধিতে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, লামা বনবিভাগের আওতাধিন ১ লক্ষ ২ হাজার ৮৫৪ একর মাতামুহুরী রিজার্ভসহ লামা ও আলীকদমের বি¯তীর্ণ বনভুমিতে মূল্যবান বনজ সম্পদ মূলী বাঁশের উৎপাদন রেকর্ড পরিমানে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে এলাকার হাজারো বাঁশ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। সে সাথে এলাকার বাঁশ ব্যবসায়ীরাও তাদের পেশা পরিবর্তন করে অন্য ব্যবসায় জড়িযে পড়েছেন।

লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন আহামদ জানান, বনবিভাগ প্রতি বছর মাতামুহুরী রিজার্ভ এলাকা বাঁশ মহাল নিলাম ইজারা দিয়ে থাকে। বাঁশ মহাল ইজারার চুক্তি অনুসারে জুন, জুলাই ও আগষ্ট এ তিনমাস বাঁশের বংশ বৃদ্ধির জন্য বাঁশ আহরণ ও চলাচল নিষিদ্ধ থাকে। এসময় বাঁশ শ্রমিকগণ বাঁশ অঅহরণ না করলেও ব্যাপক হারে বাঁশের করুল সবজী হিসেবে আহরণ করে বাজারে বিক্রী করেন। প্রধানত, একারনে বাঁশের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রাকৃতিকভাবে বাঁশের বংশ বৃদ্ধির সময় সবজীতে বাঁশ কোড়লের ব্যবহার এখনই বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রন করা না গেলে আগামীতে প্রাকৃতিকভাবে বাঁশের উৎপাদন ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে।

 

সোহেল কান্তি নাথ, বান্দরবান প্রতিনিধি