বিশ্বরেকর্ড গড়তে ভোগাই নদীতে ঝাঁপ দিলেন ৬৪ বছরের ক্ষিতিন্দ্র

গেল বছর সাঁতারে নতুন রেকর্ড গড়েছিলেন নেত্রকোনার মদন উপজেলার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য। ৬৬ বছর বয়সে সাঁতারে নেমে ১৪৬ কিলোমিটার নদীপথ বিরামহীনভাবে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এবার টানা ১৮৫ কিলোমিটার সাঁতারের বিশ্ব রেকর্ড গড়ে গিনেজ বুকে নাম ওঠানোর লক্ষ্য নিয়ে সাঁতার শুরু করেছেন সাঁতারু ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য।

এর আগে সেখানে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দূরপাল্লার এ সাঁতার কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন নালিতাবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান।

এ সময় নালিতাবাড়ী পৌরসভার মেয়র আবু বক্কর সিদ্দিক, নেত্রকোণা জেলার মদন পৌরসভার সাবেক মেয়র মোদাচ্ছের হোসেন শফিক, নালিতাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল হোসেন মাস্টার, বাঘবেড় ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সবুর, নেত্রকোনার মদন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল কুদ্দস,মদন নাগরিক কমিটি ও নালিতাবাড়ী প্রেসক্লাবের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ভোগাই নদীর দুই পাড়ে শত শত দর্শনার্থী হাত নেড়ে ক্ষিতিন্দ্রকে স্বাগত জানায়। এ সময় তাঁর নাম ধরে চিৎকার করে উৎসাহিত করতে থাকে তাঁকে। মদন উপজেলা নাগরিক কমিটি ও নালিতাবাড়ী পৌরসভা এ সাঁতার অনুষ্ঠানে ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যকে সার্বিক সহায়তা করছে।

এ সময় সাঁতারু ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এক নারী সাঁতারুর ১৭৭ কিলোমিটারের রেকর্ড ভঙ্গ করতে আমার এ সাঁতারে নামা। এর আগে আমি ১৬ ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার সাঁতারে অংশগ্রহণ করে সফল হয়েছিলাম। এবার বিশ্ব রেকর্ড গড়ে গিনেজ বুকে নাম লেখানোর উদ্দেশ্যে আমি টানা ১৮৫ কিলোমিটার সাঁতার শুরু করছি। সবার প্রার্থনা ও আশির্বাদ কামনা করে তিনি বলেন, আশা করি আমি এবারও সফল হতে পারব।

নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার বাসিন্দা প্রখ্যাত সাঁতারু মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য ১৮৫ কিলোমিটার সাঁতার প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে গিনেজ বুকে নাম লেখাবেন বলে আশা করছেন।

নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদী থেকে সাঁতার শুরু করে নেত্রকোণা জেলার কংশ ও মগড়া নদী হয়ে মদন উপজেলার দেওয়ান বাজার ঘাট পর্যন্ত ১৮৫ কিলোমিটার অতিক্রম করবেন ক্ষিতিন্দ্র। টানা ৬০ ঘণ্টা সাঁতরে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর তিনি মদনের দেওয়ান বাজার ঘাটে পোঁছাবেন।

উল্লেখ্য, বীর এই মুক্তিযোদ্ধা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এএনএস কনসালট্যান্ট হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

সাঁতরানোর স্বপ্ন দেখা শুরু করেন ১৯৭০ সালে। ওই সময় সিলেটের ধুপাদীঘি পুকুরে অরুণ কুমার নন্দীর বিরামহীন ৩০ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনী দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। পরে একই বছর মদনের জাহাঙ্গীরপুর উন্নয়ন কেন্দ্রের পুকুরে তিনি ১৫ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে এলাকায় আলোচিত হন। এটিই তার প্রথম সাঁতার।

পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে সিলেটের রামকৃষ্ণ মিশন পুকুরে ৩৪ ঘণ্টা, সুনামগঞ্জের সরকারি হাইস্কুলের পুকুরে ৪৩ ঘণ্টা, ১৯৭৩ সালে ছাতক হাইস্কুলের পুকুরে ৬০ ঘণ্টা, সিলেটের এমসি কলেজের পুকুরে ৮২ ঘণ্টা এবং ১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পুকুরে ৯৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট বিরামহীন সাঁতার প্রদর্শন করে রেকর্ড সৃষ্টি করেন।

জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করায় ওদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ডাকসুর উদ্যোগে ক্যাম্পাসে বিজয় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পুকুরে ১০৮ ঘণ্টা ৫ মিনিট সাঁতার প্রদর্শন করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জগন্নাথ হলের পুকুর পাড়ে স্মারক ফলক নির্মাণ করা হয়।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ঢাকা স্টেডিয়ামের সুইমিং পুল, মদন উপজেলা পরিষদের পুকুর এবং নেত্রকোনা পৌরসভার পুকুরে তার একাধিক সাঁতার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ভারতেরও দূরপাল্লার সাঁতার প্রর্শনীতে অংশ নিয়েছেন তিনি।

১৯৮০ সালে মাত্র ১২ ঘণ্টা ২৮ মিনিটে মুর্শিদাবাদের ভাগিরথী নদীর জঙ্গীপুর ঘাট থেকে গোদাবরী ঘাট পর্যন্ত ৭৪ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দেন। সাঁতার প্রদর্শনী ও রেকর্ড সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।