আন্দোলনের সপ্তম দিনে জিগাতলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

গতকাল শনিবার ফের হামলা করা হয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর। রাজধানীর ধানমন্ডি ও মিরপুর এলাকায় কয়েক’শ শিক্ষার্থীর উপর হামলা করা হয়। এতে শতাধিক আহতের ঘটনা ঘটে।

গতকাল ছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সপ্তম দিন। আন্দোলন দমাতে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা রাস্তায় নামবেন এবং সরকার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে এমন খবর প্রচার হওয়ার পরও গতকাল বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসে। সারা দিন তারা দাবি আদায়ে বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেয়, স্লোগান দেয়। কিন্তু ধানমন্ডির জিগাতলা এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করা হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পণ্ড করতে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা গতকাল তাদের লক্ষ করে গুলি ও ককটেল ছোড়ে। হামলাকারীরা রড, লাঠি ও বাঁশ দিয়ে তাদের বেধড়ক পেটায়। পুলিশ হামলাকারীদের পক্ষ নেয়।

আন্দোলনের সপ্তম দিনে জিগাতলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল থেকেই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও এর আশপাশে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে আন্দোলনরত কিছু ছাত্রছাত্রী গাড়ির কাগজপত্র চেক করছিলেন। সকালের দিকে আওয়ামী লীগের এক নেতার গাড়িচালকের লাইসেন্স ও কাগজপত্র চেক করতে গেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কিছু বাগ্বিতণ্ডা হয়। এরপর লাঠিসোঁটা ও ইট হাতে হামলাকারীরা শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় কয়েক দফা ফাঁকা গুলির শব্দ শোনা যায় বলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা জানায়। শিক্ষার্থীরাও গাছের ডাল, ইটপাটকেল নিয়ে হামলাকারীদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ধাওয়া দিয়ে হামলাকারীদের জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের দিকে সরিয়ে দেয়। পরে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা, রড, রামদা নিয়ে ছাত্রদের ধাওয়া দেন এবং সীমান্ত স্কয়ারের সামনে অবস্থান নেন।

 

বেলা একটার দিকে গুজব ছড়ায়, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে গেছেন। এরপর সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে শিক্ষার্থীরা সীমান্ত স্কয়ারের দিকে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছালে ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের দিক থেকে মাথায় হেলমেট পরে, হাতে লাঠি নিয়ে বিভিন্ন বয়সের লোকজন শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয়। শিক্ষার্থীরা বিজিবি ফটকের সামনে অবস্থান নেয়। ফটকের দায়িত্বে থাকা বিজিবির সেনারা হামলাকারীদের নিরস্ত করেন। একপর্যায়ে বিজিবি তাদের দায়িত্বে ফিরে যায়। এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চারজনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তাতে শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে।

আন্দোলনের সপ্তম দিনে জিগাতলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

বিকেল পৌনে চারটার সময় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের দিক থেকে ছোড়া ইটপাটকেল বিজিবি সদস্যদের গায়ে পড়লে কয়েকজন সদস্য আহত হন। তখন বিজিবির ৪০-৫০ জন সদস্য বেরিয়ে এসে দুই পক্ষকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। একই সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপও নেতা-কর্মীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। বিকেল সাড়ে চারটার সময় হামলাকারীদের মধ্য থেকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে দুই ব্যক্তিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। তাদের একজনের পরনে ছিল ফুলতোলা লাল শার্ট, অন্যজনের পরনে সবুজ রঙের পাঞ্জাবি। ছাত্ররা ধাওয়া দিলে হামলাকারীরা আবার জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের দিকে চলে যায়। মিনিট দশেক পর সাদা টি-শার্ট পরা এক যুবককে হামলাকারীদের সামনে অবস্থান নিয়ে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। গুলি ছুড়েই তিনি পুলিশের জটলার মধ্যে ঢুকে পড়েন।

আন্দোলনের সপ্তম দিনে জিগাতলায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

পুরো ঘটনার সময় পুলিশ নীরব ছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী শিক্ষার্থীদের কয়েকজনকে আওয়ামী লীগ অফিসে নিয়ে যান। ফিরে এসে সীমান্ত স্কয়ারের সামনে তারা জানায়, তাদের পুরো কার্যালয় ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মৃত্যু, ধর্ষণ বা অপহরণ সম্পর্কে তারা যা শুনেছে তা গুজব ছিল। এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত যাকেই সন্দেহ হয়েছে তাকেই পিটিয়েছে সরকারি দলের কর্মীরা। দায়িত্বরত সাংবাদিকেরাও মারধরের শিকার হন। কাউকেই মুঠোফোনে ছবি তুলতে দেওয়া হয়নি। এমনকি কথা বলার জন্য মুঠোফোন বের করলেও তা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলতে হুংকার ছাড়া হয়। কয়েকজনকে মুঠোফোনে তোলা ছবি মুছে ফেলতে (ডিলিট) বাধ্য করা হয়।

আহত শিক্ষার্থী এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতাল ও জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পপুলার হাসপাতালের সমন্বয়ক ইশতিয়াক সাজ্জাদুর রহমান জানান, তাঁদের হাসপাতালে ৪৫ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ৮-১০ জনকে সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আর এম সামিউল হাসান জানান, তাঁদের হাসপাতালে অন্তত ৫০ জন চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ১৩ জনের এক্স-রে করতে হয়েছে। চোখে মারাত্মক আঘাত থাকার কারণে একজনকে ইসলামিয়া আই হসপিটালে পাঠানো হয়েছে। আরও দুজনের মাথার আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাদের পার্শ্ববর্তী আরেকটি হাসপাতালের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে পাঠানো হয়।

 

এদিকে বিকেলে মিরপুর ১ নম্বরের পদচারী-সেতুর কাছে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের কর্মীরা হামলা চালিয়েছেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকেও মিরপুর ২ নম্বরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, এঁরা মিরপুর কলেজের ছাত্রলীগের কর্মী। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীতেও হামলা করা হয় শিক্ষার্থীদের উপর।

এদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশ, বাস মালিক ও চালক বাদী হয়ে ১১টি মামলা করেছে। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার এসব মামলা করা হলেও গতকাল এ তথ্য জানানো হয়। মামলায় আসামি হিসেবে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।