আমার ছবিকে ছিনতাই করা হচ্ছে ঃ রাশেদ রাহা

গত বছর ঢাকার পাঁচতারকা হোটেল ওয়েস্টিনে বর্ণাঢ্য এক মহরতের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় ‘নোলক’ সিনেমার। আর এই সিনেমার পরিচালক হিসেবে রাশেদ রাহার নাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এখন পরিচালক রাশেদ রাহার অভিযোগ প্রযোজক ছবিটি থেকে তাকে সরিয়ে অন্যজনকে দিয়ে দিলেন পরিচালনা করাচ্ছেন ছবিটি। আজ রোববার বিকেলে ছবির প্রযোজক সাকিব ইরতেজা চৌধুরী সনেটের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ প্রযোজক-পরিবেশক সমিতিতে অভিযোগ দায়ের করেন এই তরুণ নির্মাতা।

‘নোলক’ ছবিতে মাত্র দুটি গান আর কিছু দৃশ্যের শুটিং বাকি রয়েছে। গত ১ ডিসেম্বর থেকে টানা ২৮ দিন ছবির শুটিং হয়েছে ভারতের হায়দরাবাদ রামোজি ফিল্ম সিটিতে। পরিচালকের মতে আর মাত্র চার-পাঁচ দিন শুটিং হলেই পুরো ছবির কাজ শেষ হবে। কিন্তু এর মধ্যে জানা গেল, পরিচালক রাশেদ রাহার কাছ থেকে নাকি ছবিটি ছিনতাই হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ভারতের কলকাতায় অন্য একজন পরিচালককে নিয়ে ছবিটির শুটিং করছেন এই ছবির প্রযোজক। আর তা ছবির নায়ক শাকিব খান ও পরিচালক রাশেদ রাহা—কাউকেই জানানো হয়নি।

কান্না জড়িত কণ্ঠে পরিচালক রাশেদ রাহা বললেন- ‘একজন পরিচালকের কাছে তাঁর সৃষ্টি হচ্ছে সন্তানের মতো। আমি আমার সেই সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করছি, ঠিক তখনই প্রযোজক তাঁর ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিয়ে আরেকজনকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিতে চান! আমার ছবিকে ছিনতাই করা হচ্ছে। এত আয়োজন করে একটি ছবি শুরু করলাম। সবাই অপেক্ষায় আছে ছবিটি মুক্তির। আর কিছু কাজ মাত্র বাকী। এমন সময় প্রযোজক ছবিটি থেকে আমাকে সরিয়ে অন্যজনকে দিয়ে দিলেন পরিচালনা করতে। প্রযোজকের যদি এতোই ইচ্ছে উনাকে দিয়ে ছবি বানানোর তবে সেটি আগেই করতে পারতেন বা অন্য কোনো ছবি দিতে পারতেন। আমি শাকিব ভাইয়ের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছি।’

রাশেদ রাহা আরও বলেন- ‘মাস খানেক আগে ছবির প্রযোজক সাকিব ইরতেজা চৌধুরী আমাকে ফোন করে বলেন, এখন থেকে পরিচালক ইফতেখার চৌধুরী “নোলক” ছবির বাকি অংশের শুটিং করবেন। আমি যেন তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে নিই। তা শোনার পর আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা! যে ছবির শুটিং বাকি আর মাত্র কয়েক দিনের, তা নাকি এখন অন্য কেউ শুটিং করবেন! এ দৃশ্য আমাকে দেখতে হবে! এরপরও প্রযোজকের কথামতো আমি ইফতেখার চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তিনি আমার ফোন কিংবা এসএমএসের কোনো জবাব দেননি। এর মধ্যে একদিন দেখি, তিনি আমাকে ফেসবুকে তাঁর বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন।’ রাশেদ পরিচালক ইফতেখার চৌধুরীর বিরুদ্ধেও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

এদিকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি এবং বাংলাদেশ প্রযোজক-পরিবেশক সমিতিতে দেওয়া অভিযোগে রাশেদ রাহা লিখেন-

‘যথাবিহীত সম্মানপূর্বক বিনীত নিবেদন এই যে, আমি রাশেদ রাহা। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির একজন সদস্য। আমি ২৩/১১/২০১৭ তারিখে ‘নোলক’ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে নিবন্ধন করি। দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে বর্ণাঢ্য মহরতের মাধ্যমে আমার ওপর ছবিটি পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়। শতভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে ইতোমধ্যে ছবির ৮৫ ভাগ শুটিং সম্পন্ন করেছি। গত ১ ডিসেম্বর থেকে টানা ২৮ দিন ছবির শুটিং হয়েছে ভারতের হায়দরাবাদ রামোজি ফিল্ম সিটিতে। অভিনয় শিল্পীরা ছিলেন-শাকিব খান, ববি, ওমর সানি, মৌসুমী, তারিক আনাম খান, নিমা রহমান, রেবেকা, কলকাতার রজতাভ দত্ত, সুপ্রিয় দত্ত, অমিতাভ ভট্টাচার্য প্রমুখ।

ছবির বাকি অংশের শুটিং করার জন্য আমি অনেকদিন থেকেই প্রস্তুত। কিন্তু মাসখানেক আগে এ ছবির প্রযোজক সাকিব ইরতেজা চৌধুরী (সনেট)-এর পক্ষ থেকে বাকি অংশের শুটিংয়ের জন্য পরিচালক ইফতেখার চৌধুরীর সঙ্গে পরামর্শ করতে বলা হয়। ছবির নির্মাণকৌশল ও গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে কারও সঙ্গে পরামর্শ করতে আগ্রহী ছিলাম না। বিভিন্ন সূত্রে হঠাৎ জানতে পারি, আমাকে ছাড়াই পরিচালক ইফতেখার চৌধুরীকে দিয়ে ‘নোলক’ ছবির বাকি অংশের কাজ শেষ করার জন্য প্রযোজক ইতোমধ্যেই একটি দল নিয়ে গতকাল ২১ জুলাই কলকাতায় পৌঁছেছেন। পুরো ব্যাপারটা ঘটেছে আমার অজ্ঞাতে।’

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন এই অভিযোগপত্র হাতে পেয়েছেন বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন- ‘কিছুক্ষণ আগে অভিযোগপত্রটি হাতে এসেছে। অভিযোগ পাওয়ার পর আমি ইফতেখার চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। সে বর্তমানে ভারতে রয়েছে। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে অবশ্যই এর ব্যবস্থা নেয়া হবে। একটা ছবির মূল পরিচালক যদি ছবি করতে আগ্রহী না হয়, সেক্ষেত্রে প্রযোজক অন্য পরিচালক দিয়ে ছবি শেষ করতে পারেন। কিন্তু পরিচালকের অনুমতি ছাড়া অন্য পরিচালককে দিয়ে ছবির শেষ করার কোনো নিয়ম নেই। এমন অনিয়মের প্রমাণ পেলে ইফতেখার চৌধুরীর সদস্যপদ বাতিল হয়ে যেতে পারে। এটা আমাদের মিটিংয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব। ’

এদিকে ‘নোলক’ ছবির পরবর্তী অংশের শুটিং করতে এখন ভারতের কলকাতায় আছেন মৌসুমী, ওমর সানি, ববি, তারিক আনাম খান খান, রূপসজ্জাশিল্পী মানিকসহ আরও অনেকে। পরিচালক ইফতেখার চৌধুরীও ‘নোলক’ ছবির শুটিং স্পটে আছেন। এদিকে প্রযোজক সাকিব ইরতেজা চৌধুরী আজ রোববার দুপুরে কলকাতা থেকে মুঠোফোনে বলেন- ‘আমার সঙ্গে পরিচালক হিসেবে রাশেদ রাহার কোনো চুক্তি হয়নি। এই ছবির পরিচালক এখন আমি। শুরু থেকে শুটিংয়ের বিষয়টি আমিই তদারকি করেছি। আমি ঢাকায় এসে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলব। ২৫ জুলাই পর্যন্ত আমাদের শুটিং চলবে।’

অথচ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নথিতে দেখা যায়, গত বছর ২৩ নভেম্বর ‘নোলক’ ছবির নামটি নিবন্ধন করা হয়। আর সেখানে পরিচালক হিসেবে রয়েছে রাশেদ রাহার নাম। এমনকি ছবির মহরতের সময় পরিচালক হিসেবে রাশেদ রাহাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন ‘নোলক’ ছবির শুটিংয়ের সেটেও তাঁকেই পরিচালনা করতে দেখা গেছে। তাছাড়া ছবির অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, সেখানে কিন্তু পরিষ্কার লেখা আছে- “নোলক। একটি রাশেদ রাহা চলচ্চিত্র।”

এ ব্যাপারে অভিযোগ করে সাকিব ইরতেজা চৌধুরী বলেন- ‘পরিচালক হিসেবেই তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুটিংয়ের সময় রাশেদ রাহা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। সবকিছু আমাকেই করতে হয়েছে। এখন আমি ছবির প্রযোজকের পাশাপাশি পরিচালকও।’ ইফতেখার চৌধুরীর ব্যাপারে সাকিব ইরতেজা চৌধুরী বলেন- ‘আমি রাশেদ রাহাকে বলেছি, ইফতেখার চৌধুরী যেহেতু ভিএফএক্সের কাজ ভালো বোঝেন, তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে। কারণ, এই ছবিতে গ্রাফিকস আর অ্যানিমেশনের কাজ আছে। তিনি কিন্তু এই ছবির পরিচালক নন।’

এমনকি ছবির নায়ক শাকিব খানও জানেন না যে, কলকাতায় এখন ‘নোলক’ ছবির শুটিং হচ্ছে। পরিচালককে বাদ দিয়ে সেখানে শুটিং হচ্ছে জেনে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করছেন। তরুণ পরিচালক রাশেদ রাহা এবং প্রযোজক সাকিব ইরতেজা চৌধুরীকে নিয়ে মহরত অনুষ্ঠানে শাকিব খান বলেছিলেন- ‘আধুনিক ও মানসম্মত বাংলা সিনেমা “নোলক”। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে ভালো বাংলা সিনেমা নির্মাণ করা যায়, এটি হবে তার উদাহরণ। আর তা তরুণেরাই করে দেখাবে।’

প্রসঙ্গত, ‘নোলক’ পরিচালক রাশেদ রাহার প্রথম চলচ্চিত্র। এর আগে এই পরিচালক কয়েকটি নাটক নির্মাণ করেছেন।