কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি, ভাঙনের কবলে তীরবর্তী মানুষ

উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রসহ কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে চলা সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার সদর উপজেলার ধরলা অববাহিকা ও রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের তিস্তা অববাহিকাসহ ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদ অববাহিকার নাগেশ্বরী ও উলিপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বন্দি হয়ে পড়েছে এসব এলাকার অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষ। 

পানি বৃদ্ধির সঙ্গে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন বন্যা ও ভাঙন কবলিতরা। বন্যায় কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি জীবনযাপন করলেও সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে এখনও কোনও ত্রান তৎপরতা শুরু হয়নি।

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বৃহস্পতিবার (৬ জুলাই) সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি ফেরিঘাট (সেতু পয়েন্ট) পয়েন্টে ৪৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৩২ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ৩৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শুক্রবার (৬ জুলাই)  বিকাল থেকে নদীর পানি কমতে শুরু করবে জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাপ্ত পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদ ছাড়া অন্যান্য নদ-নদীর পানি কমতে থাকবে।’

জেলার সদর ও ফুলবাড়ী উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সদর উপজেলার হলোখানা, ভোগডাঙ্গা ও পাঁচগাছি ইউনিয়নের ধরলা অবাহিকার শতাধিক পরিবারের লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গ্রামীণ সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বন্যা কবলিত মানুষজন যোগাযোগ ভোগান্তিতে পড়েছেন। চলাচলের জন্য অনেকে নৌকা কিংবা কলা গাছের ভেলা ব্যবহার করছেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার( ৫ জুলাই) ভোর রাতে সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের সারডোব গ্রামের এলাকাবাসীর নির্মিত একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ওই গ্রামের অর্ধশত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়াও সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ও পাঁচগাছী ইউনিয়নের বেশ কিছু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধির কারণে তলিয়ে গেছে এসব এলাকার পটল, ঢেড়স, মরিচসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেত।

ব্রহ্মপুত্রে পানি বৃদ্ধির ফলে উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মশালের চর এলাকায় প্রায় ৫০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওই ইউনিয়নে শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। গত তিন দিনে বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের আল-আমিন বাজার, আকেল মামুদ ও খুদিরকুটি গ্রামের শতাধিক পরিবার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন। তিনি জানান, ‘ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি ফলে তার ইউনিয়নের মশালের চর গ্রামের বেশ কিছু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের ফলে ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করার পরও এখন পর্যন্ত ভাঙন প্রতিরোধ কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিয়তায় কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

এছাড়াও চিলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকল বাঁধ এলাকাসহ উলিপুর উপজেলার থেতরাই ও বুড়াবুড়ি ইউনিয়নেও নদী ভাঙন চলছে। ভাঙন রক্ষা পেতে বাড়ি-ঘর সরিয়ে নিচ্ছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের বলা হয়েছে জানিয়ে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যা ও নদী ভাঙনে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করতে বলেছি। তালিকা পেলে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।’

এদিকে অব্যাহত পানি বৃদ্ধিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেশ কিছু বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, চিলমারী, উলিপুর ও নাগেশ্বরী উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের ঢাল দেবে গেছে। ধরলা নদীর ডান তীরের বাঁধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে এই প্রকৌশলী বলেন, ‘আমরা বাঁধগুলো মেরামতের চেষ্টা করছি।’

রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শহিদুল জানান, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে ওই ইউনিয়নের ৫ ও ৮ নং ওয়ার্ডের চর গতিয়াসাম, মাঝের চর ও কিতাব খাঁ গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বাড়িতে পানি প্রবেশ করায় রান্না করার কোনও উপায় পাচ্ছেন না বানভাসিরা। এমতাবস্থায় বন্যাকবলিতদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে শুকনো খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে জানান এই ইউপি সদস্য।

রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাশেদুল হক প্রধান জানান, ‘তিস্তা অববাহিকার বেশ কিছু এলাকায় পানি বৃদ্ধির খবর পেয়ে আমি বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। আমরা কাল পরশু মধ্যে বন্যাকবলিতদের হাতে সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

অন্যদিকে নাগেশ্বরীতে উজানের পাহাড়ি ঢলে দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গাধর, ফুলকুমর, শংকোষসহ বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। লোকালয়ে ঢুকে প্লাবিত করেছে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল। অব্যাহত পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে এ দুই নদসহ অন্যান্য নদ-নদীগুলোতেও। এসব নদ-নদীর পানি দুই কূল ছাপিয়ে লোকালয়ে ঢুকে ইতিমধ্যে প্লাবিত করেছে কেদার ইউনিয়নের বালাবাড়ী, চর বিষ্ণুপুর, শামছুলেরচর, মন্ডলের চর, পুটিমারীরচর, ছালামের চর, পশ্চিমেরচর, বল্লভেরখাসের শিকদার পাড়া, কৃষ্ণপুর, কাটগিরিরচর, পাড়েরভিটা, বলরামপুর, কচাকাটার ধনিরামপুর, শৈলমারী, ঝিঞ্জিরা বালারচর, তরিরহাট, নারয়নপুরের চৌদ্দঘুড়ি, পাখিউড়া, মাঝিয়ালী, পদ্মারচর, অষ্টআশিরচর, বালার হাট, নুনখাওয়ার বোয়ালমারী, চরকাপনা, ফকিকেরচর, মাঝেরচর, কালীগঞ্জের ফান্দির ভিটা, কুমেদপুর, ভেরভেরি, সাহেবগঞ্জ, ধনীরপাড়, বেরুবাড়ীর শালমারা, খেলারভিটা, চর রহমানেরকুটি, বামনডাঙ্গার লুছনি, পাঁচমাথা, মিনাবাজার, পানাতিটারী, রায়গঞ্জের দামালগ্রামসহ বিভিন্ন গ্রাম।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইয়াসির আরাফাত জানান, ‘এখনও ত্রাণ সহায়তা শুরু হয়নি। বন্যার্ততের ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে তালিকা পেলে দ্রুত সেগুলো বন্টন করা হবে।’

জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন জানিয়েছেন, ‘সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউএনওদের কাছে তালিকা চাওয়া হয়েছে। আমরা খুব দ্রুত শুকনো খাবার বিতরণ শুরু করবো। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় যেকোনও ধরণের সহায়তার জন্য প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।’

ভাঙনের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ভাঙনের খবর পাওয়ামাত্র তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে।’

মোঃ মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি