দৃশ্যমান হল স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ৭৫০ মিটার!

দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজ। আজ সেতুর জাজিরা পয়েন্টে বসানো হয়েছে পঞ্চম স্প্যান। এর ফলে দৃশ্যমান হল সেতুর প্রায় ৭৫০ মিটার। এরই মধ্যে সেতুর ৫৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

আজ শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা প্রান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের ওপর এই সুপার স্ট্রাকচার বসানো হয়। পঞ্চম স্প্যানটি বসানোর ফলে ৭৫০ মিটার দৃশ্যমান হলো পদ্মা সেতু।

বাংলাদেশ সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম স্প্যান বসানো হয়েছিল জাজিরার প্রান্তে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে। চলতি বছর ২৮ জানুয়ারি ৩৮ ও ৩৯ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় দ্বিতীয় স্প্যান। গত ১১ মার্চ ৩৯ ও ৪০ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় তৃতীয় এবং গত ১৩ মে ৪০ ও ৪১ নম্বর খুঁটির ওপর চতুর্থ স্প্যান বসানো হয়। ফলে সেতুর ৬০০ মিটার অংশ দৃশ্যমান হয়। আজ এর সঙ্গে যোগ হলো ১৫০ মিটার।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে সেতুর জাজিরা প্রান্তে ৪১ ও ৪২ নম্বর খুঁটির কাছেই পৌঁছে যায় ‘৭এফ’ নম্বর স্প্যানটি। মুন্সীগঞ্জের মাওয়ার কুমারভোগে অবস্থিত ইয়ার্ডে এটি তৈরি করা হয়। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কুমারভোগের বিশেষায়িত ওয়ার্কসপ জেডি থেকে তিন হাজার ৬০০ টন ধারণক্ষমতার ভাসমান ক্রেনবাহী জাহাজটি প্রায় তিন  হাজার ২০০ টন ওজনের স্প্যানটি পাজা করে তুলে নিয়ে যায়। যদিও এটি রওনা হওয়ার কথা ছিল বুধবার। কিন্তু পদ্মায় অস্বাভাবিক ঢেউ থাকায় জাহাজটি রওনা হয় গতকাল।

এর আগে ৪২ নম্বর খুঁটির ঢালাই সম্পন্ন এবং জমাটবাঁধা নিশ্চিতসহ সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। পদ্মায় এখন সেতুর কাজের প্রসার বেড়েছে। এরই মধ্যে ৯টি খুঁটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এগুলো হচ্ছে মাওয়ার ৩, ৪, ৫ এবং জাজিরা প্রান্তের  ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১ ও ৪২ নম্বর খুঁটি। এ ছাড়া ১৩ নম্বর খুঁটির কাজ শেষ হতে যাচ্ছে। এ নদীতে এ পর্যন্ত ১৫০টি পাইল স্থাপন হয়ে গেছে। শিগগিরই মাওয়া প্রান্তে স্প্যানের কাজ শুরু হবে।

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পদ্মা সেতু। এরপর এ বছরের ২৮ জানুয়ারি ৩৮ ও ৩৯ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় দ্বিতীয় স্প্যান। গত ১১ মার্চ ৩৯ ও ৪০ নম্বর খুঁটির ওপর বসে তৃতীয় স্প্যান। সর্বশেষ ১৩ মে ৪০ ও ৪১ নম্বর খুঁটির ওপর চতুর্থ স্প্যান বসানো হলে সেতুর ৬০০ মিটার দৃশ্যমান হয়।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, স্প্যানগুলো শতভাগ স্টিলের তৈরি। প্রতিটি স্প্যানের ওজন দুই হাজার ৮০০ টন। ওজন ধারণ করে বিশেষ বিয়ারিং। এ বিয়ারিংয়ের ওপর থাকে স্প্যান। বিয়ারিংয়ের কারণে সেতুতে চাপ পড়লে তা কাঁপতে থাকে। সেতুর স্প্যান বসানোর আগে পিলারের মাথায় যে বিয়ারিং বসানো হয়েছে তা বিশ্বে বিরল। ১০ টনের বেশি ওজনের একেকটি বিয়ারিং। রিখটার স্কেলে সাড়ে সাত মাত্রায় ভূমিকম্প হলেও সেতুর ক্ষতি হবে না। পুরো সেতুতে ৯৬টি বিয়ারিং ব্যবহার করা হবে। বিয়ারিং বসানো হয় পিলারের ওপর ও স্প্যানের নিচে।

এ সেতুর কাজ শেষ হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে গোটা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে। দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে। পদ্মা সেতুর দুই পারে গড়ে উঠবে সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের আদলে বিশ্বমানের শহর। সেইসঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে। ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে বলে আশা করছে পদ্মা পারের মানুষ।

দ্বিতলবিশিষ্ট পদ্মা সেতু হচ্ছে, মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরার মধ্যে। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য (পানির অংশের) ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। ডাঙার অংশ ধরলে সেতুটি প্রায় নয় কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। খুঁটির ওপর ইস্পাতের যে স্প্যান বসানো হবে, এর ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। আর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন। পুরো সেতুতে মোট খুঁটির সংখ্যা হবে ৪২। একটি থেকে আরেক খুঁটির দূরত্ব ১৫০ মিটার। এই দূরত্বের লম্বা ইস্পাতের কাঠামো বা স্প্যান জোড়া দিয়েই সেতু নির্মিত হবে। ৪২টি খুঁটির ওপর এ রকম ৪১টি স্প্যান বসানো হবে। এর মধ্যে তিনটি স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। স্প্যানের অংশগুলো চীন থেকে তৈরি করে সমুদ্রপথে জাহাজে করে আনা হয় বাংলাদেশে। ফিটিং করা হয় মাওয়ার কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে।

বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই বছরের ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। বর্তমান ব্যয় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি।