দিনাজপুরে একবছরেও শুকায়নি বন্যার ক্ষত

“বানের পর সরকার কহিল-বান পালাইলেই সরকার হামার রাস্তা-ঘাট তামান ঠিক করি দিবে। কিন্তু বান (বন্যা) পালাবার প্রায় একবছর হচে। একবছর ধরি হামাক এখনও সেই কষ্টই করিবা হচে। কই, রাস্তা-ঘাট তো এখনও ঠিক হইল নাই। ভাঙ্গা রাস্তাত ঠিকমত ভ্যানও চালাবা পারেছি নাই-আয় রোজগারও কমি গেইছে। একটা বান পালাইয়া কয়েকদিন পর আরও বান আসিবে। হামার রাস্তা-ঘাটগুলা ঠিক হবে কখন?”

দিনাজপুরের সদর উপজেলার ১নং চেহেলগাজী ইউনিয়নে জামতলী-নশিপুর রাস্তায় গতবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত খালপাড়া ব্রীজ পার হওয়ার সময় এমনভাবে তার দুঃখের কথা জানাচ্ছিল ভ্যানচালক রশিক রায়। গত বছর (২০১৭) আগষ্ট মাসের ভয়াবহ বন্যায় জামতলী-নশিপুর সড়কের খালপাড়া নামক স্থানে গুরুত্বপুর্ণ একটি ব্রীজের দু’পাশ ভেঙ্গে যায়। দীর্ঘদিন পর বালু দিয়ে কোনমতে সংস্কার করা হলেও গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে আবার বালু সরে গিয়ে আবার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। ফলে আবার দুর্ভোগে পড়েছে এই ব্রীজের উপর দিয়ে চলাচলকারী তিন উপজেলার হাজার হাজার মানুষ। গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্রীজের দু’পাশে বালু সরে গিয়ে আবার চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় লোকজন নিজ উদ্যোগেই সংস্কারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

শুধু খালপাড়া ব্রীজ নয়, গতবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ গ্রামীণ পাকা সড়ক ও কালভার্টের মেরামত করা হয়নি।

দিনাজপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী ফারুক হোসেন জানান, খালপাড়া ব্রীজের দু’পাশে সংস্কারের জন্য ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। টেন্ডার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু ঠিকাদার সময়মতো কাজ না করায় সেই টেন্ডার বাতিল হয়। আবার টেন্ডার আহ্বান করে কাজ করা হবে।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার আজিমপুর গ্রামে গ্রামীণ পাকা সড়কের বিভিন্ন স্থানে গতবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার মেরামত করা হয়নি। সরকারীভাবে বরাদ্দের কথা বলা হলেও দৃশ্যমান কোন কাজ হয়নি অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্টের।

বীরগঞ্জ উপজেলার ৩ নং শতগ্রাম ইউনিয়নে বলদিয়া ব্রীজ, রাঙ্গালীপাড়া ব্রীজ, কাশিমনগর সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক এখন পযন্ত সংস্কার ও মেরামত করা হয়নি। ফলে দুর্ভোগের মধ্যেই চলাচল করতে হচ্ছে এসব এলাকার মানুষকে।

এ ব্যাপারে বীরগঞ্জ উপজেলার ৩নং শতগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কেএম কুতুবউদ্দীন জানান, বলদিয়া ব্রীজের টেন্ডার হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। কিন্তু কাজ এখনও শুরু হয়নি। এছাড়াও রাঙ্গালীপাড়া ব্রীজ, কাশিমনগর সড়ক সরকারীভাবে সংস্কার ও মেরামত করা হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে কোনভাবে আংশিক মাটি ভরাট করে চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে তা স্থায়ী নয়। আবার বন্যা তো দুরের কথা ভারী বর্ষন  হলেই তা ভেঙ্গে পড়বে বলে জানান তিনি।

এক বছর অতিক্রম হওয়ার পর আবার বন্যা আসার সময় হলেও সংস্কার ও মেরামত করা হয়নি অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্ট। ফলে গতবছরের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত নিয়ে এখনও চলাচল করতে হচ্ছে গ্রামীন জনপদের মানুষকে।

দিনাজপুর স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী খলিলুর রহমান জানান, গতবছরের বন্যায় দিনাজপুর জেলার ৯২টি কালভার্ট ও ২০৩ কিলোমিটার পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত  এসব কালভার্ট ও সড়ক মেরামত করতে মোট ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৮৬ কোটি টাকা। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। কিছু কিছু কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি জানান, চলতি বর্ষা মৌসুম শেষ না হলে বাকী কাজ করা সম্ভব নয়।

 

শেখ জাকির হোসেন, দিনাজপুর প্রতিনিধি