ফরিদপুরে নদী ভাঙন আতঙ্ক, নির্ঘুম লাখো মানুষ

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলায় বর্ষা শুরুর আগেই ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ পাড়ের লাখো মানুষ। কয়েক বছরের ভাঙনে ইতিমধ্যেই দুই উপজেলার কয়েক হাজার একর ফসলি জমি, বসতঘর, শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

মানচিত্র থেকে মুছে গেছে শতাধিক গ্রাম। এদিকে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে বেড়িবাঁধের ওপর। সেখানে তারা বেশ কয়েক বছর মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারিভাবে বেশ কয়েকটি আশ্রায়ন প্রকল্প করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।

১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত চরভদ্রাসন উপজেলার চারটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার একর ফসলি জমি, ৩৯টি গ্রাম, ১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, ৪৫টি মসজিদ মাদরাসাসহ অসংখ্য রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, স্লুইসগেট এবং স্থানীয় আমিনখাঁর হাট ও চরহাজিগঞ্জ বাজারের একাংশ পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর চরভদ্রাসনের চরহাজিগঞ্জ বাজার রক্ষার জন্য ৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বাজারের চার পাঁশ দিয়ে সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে বাজার রক্ষার কাজ করা হয়। এ সময় চরহাজিগঞ্জ বাজারের পশ্চিম পাঁশে দুই কিলোমিটার ও এমপি ডাঙ্গীর ১ হাজার ৭০০ মিটার পদ্মা নদীর পাড় আরও কাজ বাকি থাকে। ওই স্থান থেকে ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।

বছরের শুরুতে ভাঙন কবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে আসেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম খাঁন। সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ ও স্থানীয় এমপি মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। এ সময় তাঁরা আশ্বাস দিয়েছিলেন পদ্মা রক্ষায় বাঁধ নির্মাণে ব্যবস্থা নেবেন। তাদের অশ্বাসে আশায় বুক বেঁধেছিল স্থানীয় জনগণ। কিন্তু নদী শাসনের উপযুক্ত সময় পার হলেও ভাঙন রোধের কোনো আলামত চোখে পড়ছে না। ফলে অস্থিরতা ও উৎকন্ঠায় দিন কাটছে এলাকাবাসীর। কবে নাগাদ নদী শাসনের কাজ শুরু হবে এ প্রত্যাশায় প্রহর গুনছে চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মাপাড়ের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ।

এমপি ডাঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা রাবেয়া বেগম বলেন, প্রতিবছরই নদী ভাঙছে। বাড়ি ঘর সরাতে সরাতে আর সরানোর জায়গা নেই। আমার সবকিছু গিলে খেয়েছে এই নদী।

তিনি বলেন, রাতে ভয়ে ঘুমাতে পারি না। রাতে ভাঙন শুরু হলে কোনো জায়গায়ই যেতে পারবো না। তাই রাতে জেগে থাকি।

চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এজিএম বাদল আমিন বলেন, এমপি ডাঙ্গী পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে দুই দফায় ২ কোটি টাকার কাজ করা হলেও কাজ শেষেই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এ বছর নদী শাসনের কাজ শুরু না হলে উপজেলা পরিষদ হাসপাতাল, সরকারি কলেজ, পাইলট হাইস্কুল, হাটবাজারসহ ব্যাপক এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফরিদপুরে নদী ভাঙন আতঙ্ক, নির্ঘুম লাখো মানুষ ১

এদিকে সদরপুর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ফসলি জমি, প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম, কয়েক হাজার বসত বাড়ি ও অর্ধশতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটছে পদ্মা পাড়ের উপজেলার চরমানাইর, চর নাছিরপুর, দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া, ঢেউখালি ও আটোকেরচর ইউনিয়নে বসবাসকারী মানুষেরা।

সদরপুর উপজেলার চরমানাইর ইউনিয়নের চরবন্দরখোলা গ্রামের নাহার বেগম জানান, কয়েকদিন আগে তার বসতভিটা নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এই নিয়ে পাঁচবার নদী ভাঙনের শিকার হলেন তিনি। এখন নতুন করে বাড়িঘর নির্মাণ করার চিন্তা গ্রাস করছে তাকে।

শুধু নাহার বেগম নয় এমন গল্প নদী পাড়ের অনেকেরই। নদী ভাঙনের শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত সহায়-সম্পদ হারাচ্ছে নদীপাড়ের মানুষ। সম্পদ হারানোর আতঙ্কে দিশেহারা নদী তীরের মানুষরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ বলেন, সদরপুর ও চরভদ্রাসনের ৯টি ইউনিয়ন পদ্মার ভাঙনে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ। দুই উপজেলার পদ্মা রক্ষা বাঁধ নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতিবছরই ভাঙনের কারণে মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। অসহায়ভাবে জীবনযাপন করছে সব হারানো মানুষগুলো।

সদরপুর উপজেলার চরমানাইর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী জানান, গত ১৫ বছরে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে কয়েক হাজার ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। হাজারো পরিবার তাদের বসতবাড়ি হারিয়েছে। তারা এখন বেড়ি বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে।

সদরপুর উপজেলার চর নাছিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্কাস আলী বলেন, চর নাছিরপুর ইউনিয়নটির বেশির অংশই চরাঞ্চল কেন্দ্রিক। তাই ভাঙনতো লেগেই আছে। ভারি বর্ষণ হলে তার সঙ্গে যোগ হয় বন্যা। দুইয়ে মিলে বছরের বেশির ভাগ সময়ই পানিবন্দি থাকে এই ইউনিয়নের মানুষ। নদী ভাঙনের ফলে কয়েক হাজার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, চরভদ্রাসন ও সদরপুরে পদ্মা রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ৩৩২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেক কমিটিতে জমা রয়েছে। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হলে প্রক্রিয়া শেষে কাজ শুরু করা হবে।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি