পাঠকশূণ্য ১২৩ বছরের পুরনো পাবলিক লাইব্রেরী!

সুসজ্জিত পাকা একটি ভবনে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। এর মধ্যে দুর্লভ বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিদিন রাখা হয় দুটি করে সংবাদপত্র। আছে পর্যাপ্ত আসবাবপত্রও। বই পড়ার জন্য এ রকম কোলাহলমুক্ত নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া দুষ্কর।

তবে যাদের জন্য এত আয়োজন, সে পাঠকদেরই দেখা নেই। বলা হচ্ছে, কুড়িগ্রামের ১২৩ বছরের পুরনো পাবলিক লাইব্রেরির কথা। প্রতিদিন একজন খণ্ডকালীন লাইব্রেরিয়ান সকাল-বিকাল পাঠাগারের দরজা খোলেন ও বন্ধ করেন। এখানে কদাচিৎ পাঠকের দেখা পাওয়া যায়। তাও হাতে গোনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপন করা হয় ১৮৯৫ সালে। খাতা কলমে এর সদস্য সংখ্যা মাত্র ১৬০ জন। তবে তারা কেউই এখন আর লাইব্রেরিতে আসেন না। নিয়ম অনুযায়ী চাঁদাও দেন না। ক্যাটালগার না থাকায় বইগুলোর ক্যাটালগভিত্তিক তালিকা নেই। তাই পছন্দের বই খুঁজে পেতে পাঠককে অনেক সময় নষ্ট করতে হয়।

নয়ন সরখেল নামে এক ব্যক্তি খণ্ডকালীন লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ও বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত লাইব্রেরিটি খোলো রাখেন তিনি। এজন্য মাসে তাকে ২ হাজার টাকা ভাতা দেয়া হয়। যুগের চাহিদার সাথে তার ভাতা কতটা মানানসই তার হিসাব বুঝতে আর বাকী নয়। নয়ন জানান, মাঝেমধ্যে ১০-১৫ জন পাঠক সংবাদপত্র পড়তে আসেন। এছাড়া আর কোনো পাঠক আসেন না।

লাইব্রেরির সামনে ১০টির মতো দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা ভাড়া আসে। এটাই নিয়মিত আয়ের একমাত্র উৎস। এছাড়া সরকারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুদান মাঝেমধ্যে পাওয়া যায়।

স্থানীয় ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর ইসলাম রজব জানান, লাইব্রেরিতে কোনো পাঠক আসেন না। নিয়মিত কোনো সদস্য নেই। তারপরও ঘুরে-ফিরে কয়েক জনকে নিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হচ্ছে। অথচ কমিটির দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই।

লাইব্রেরি চত্বরটি এখন পাইকারদের কাটা গাছ ও ট্রাক, কার্ভাড ভ্যান ও পিকআপ রাখার স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এছাড়া লাইব্রেরির কয়েকটি গাছও সম্প্রতি কেটে বিক্রি করা হয়েছে।

পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি ও কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা একেএম সামিউল হক নান্টু জানান, গাছ কাটার কথা তিনি জানেন না। তাছাড়া সভা নিয়মিত হয় না। ফলে লাইব্রেরির হালনাগাদ তথ্য তার জানা নেই।

লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহাবুদ্দিন বলেন, পরিচালনা কমিটির সর্বশেষ সভা ২০১৭ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সভায় গাছ কাটার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এগুলো দিয়ে ঘর ও আসবাবপত্র মেরামত করা হবে।

তিনি আরো জানান, ১৯৮৪ সালে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে এখানে যোগ দেন। ১৯৯৬ সাল থেকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

পদাধিকার বলে লাইব্রেরিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, ‘কুড়িগ্রামে আমি নতুন এসেছি। তাই লাইব্রেরিটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আমার জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে লাইব্রেরিটির সমস্যা সমাধান ও পাঠক সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে ইন্টারনেট ভিত্তিক তথ্য ও বিনোদন আর মাদকের সহজলভ্যতাই এই পাঠকশূণ্যের জন্য দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজ্ঞ প্রবীণ ব্যক্তিরা।

 

মোঃ মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি