বন্যার ক্ষত নিয়ে দুর্ভোগে দিনাজপুরের গ্রামীণ জনপদের মানুষ

বন্যার প্রায় ৯ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের ১৩ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ। গত বছরের বন্যায় দিনাজপুরের ৭৮টি সেতু এবং ২০৪ কিলোমিটারেরও বেশি গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এসব সেতু ও সড়ক এখন পর্যন্ত মেরামত না করায় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অন্যদিকে শুরু হয়েছে আগাম বৃষ্টিপাত। ফলে রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্টগুলো ঠিক না থাকায় দিনাজপুরবাসীর দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।গ্রামীণ রাস্তাঘাট সংস্কার ও তৈরির সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)।

এলজিইডি দিনাজপুরের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের বন্যায় দিনাজপুরে আংশিক ৫৭টি এবং সম্পূর্ণরূপে ২১টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা ছাড়া জেলার ২০৪ কিলোমিটার রাস্তা বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের (এনডিআরসিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের বন্যায় দিনাজপুরে ২৬৭ কিলোমিটার রাস্তার ক্ষতি হয়েছে।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, সদর উপজেলায় সাতটি সেতু ও ২০ কিলোমিটার রাস্তা, বীরগঞ্জে ১৮টি সেতু ও ২৫ কিলোমিটার রাস্তা, নবাবগঞ্জে পাঁচটি সেতু ও আট কিলোমিটার রাস্তা, বোচাগঞ্জে চারটি সেতু ও আট কিলোমিটার রাস্তা, ফুলবাড়ীতে আটটি সেতু ও ২০ কিলোমিটার রাস্তা, কাহারোলে চারটি সেতু ও ২১ কিলোমিটার রাস্তা, খানসামায় সাতটি সেতু ও ২৫ কিলোমিটার রাস্তা, বিরলে ২০টি সেতু ও ১৩ কিলোমিটার রাস্তা, বিরামপুরে একটি সেতু ও তিন কিলোমিটার রাস্তা, পার্বতীপুরে একটি সেতু ও ৩০ কিলোমিটার রাস্তা, চিরিরবন্দরে তিনটি সেতু ও ৩৫ কিলোমিটার রাস্তা, ঘোড়াঘাটে তিন কিলোমিটার এবং হাকিমপুরে তিন কিলোমিটার রাস্তার ক্ষতি হয়েছে।

এসব সেতু ও রাস্তাঘাট পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন করতে ৮০ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদন দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু বন্যার প্রায় ৯ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো এসব সেতু ও সড়কের সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। ফলে বন্যার ক্ষত নিয়ে এখনো দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরবাসী।

দিনাজপুর সদর উপজেলার ১ নম্বর চেহেলগাজী ইউনিয়নের জামতলী থেকে বিরল ও কাহারোল উপজেলায় যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি বন্যায় পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। নশিপুর খালপাড়া গ্রামের রাস্তাটির দুটি স্থানে ভেঙে গেছে, মাঝখানে শুধু সেতুটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। খালপাড়া গ্রামের রাস্তাটি দিয়ে বিরল উপজেলার আজিমপুর, রাজারামপুর, হাসিলা, রাজুরিয়া, ঝিনাইকুড়ি ও কাহারোল উপজেলার ঈশ্বরগ্রাম, বাড়িভাসা, পরমেপুরসহ প্রায় ১৫ গ্রামের লোকজন চলাচল করে। কিন্তু বন্যার পর এ রাস্তা দিয়ে চলাচল একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। বাঁশের তৈরি সাঁকো দিয়ে শুধু খালি ভ্যান-রিকশা ও সাইকেল-মোটরসাইকেল যাওয়া-আসা করছে।

বিরল উপজেলার আজিমপুর গ্রামের প্রদীপ চন্দ্র রায় জানান, এলাকার কোনো মানুষ অসুস্থ হলে সরাসরি হাসপাতালে নেওয়া যেত; কিন্তু রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। সদর উপজেলার মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে ১ নম্বর চেহেলগাজী ইউনিয়নের কর্ণাই গ্রাম। এ গ্রামের এক কিলোমিটার রাস্তার দুটি স্থানে মাঝ বরাবর ভেঙে গেছে। আবার অনেক স্থানে ভেঙে অর্ধেক হয়ে গেছে। এ রাস্তা দিয়েই আশপাশের পাঁচটি গ্রামের মানুষ চলাচল করছে। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় ভ্যান-রিকশা যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভাঙা দুটি স্থানে বাঁশ দিয়ে সাঁকো তৈরি করা হয়েছে।

বীরগঞ্জের আটটি আংশিক ও ১০টি সেতু সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ নম্বর শতগ্রাম ইউনিয়নের বলদিয়াপাড়া  সেতু ও পূর্ব রাঙ্গালী পাড়া সেতু দিয়ে কোনো প্রকার যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। ঝাড়বাড়ী থেকে বটতলা হয়ে আত্রাই নদী পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাস্তা ভেঙে জমিতে বালু জমে যাওয়ায় জমিগুলোতে আবাদও হচ্ছে না। বোচাগঞ্জের ৪ নম্বর আটগাঁও ইউনিয়নের বরুয়া সেতুটি এখনো সংস্কার করা হয়নি।

দিনাজপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী খলিলুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এসব সেতু ও সড়ক মেরামতের জন্য ৮০ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বরাদ্দ চেয়ে এলজিইডি সদর দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এরই মধ্যে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

শেখ মোঃ জাকির হোসেন, বীরগঞ্জ প্রতিনিধি