মা দিবসে ‘আপন নিবাস’ বৃদ্ধাশ্রমের মায়দের গল্প

ত্রি-ভূবনের সবচেয়ে মধুরতম শব্দ ‘মা’। মা উচ্চারণের সাথে সাথে হূদয়ে অতল গহীনে যে আবেগ ও অনুভূতি রচিত হয়, তাতে অনাবিল সুখের প্রশান্তি নেমে আসে। রোববার (১৩ মে) ‘বিশ্ব মা দিবস’ পালিত হয়েছে। বিশ্বের সকল মাকে উৎসর্গ করা দিন। প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার এই দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়।

প্রতিটি মা দিবসেই আমরা আমাদের নিজ নিজ মা কে স্মরণ করি। কিন্তু এমন কিছু মা রয়েছেন যারা তাদের সন্তানদের কাছ থেকে ‘মা’ ডাকটি শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকেন। কিন্তু অবহেলিত সেই মা দের এতটুকু সৌভাগ্য হয়না তাদের সন্তানদের কাছ থেকে ‘মা’ ডাকটি শোনার। কারন তারা আজ বৃদ্ধাশ্রমে। সন্তানদের কর্মব্যস্ত জীবনে একটুখানি ঠাই নেই তাদের। আজকের এই মা দিবসে ডেইলি মেইল ২৪ টিম এমনি এক বৃদ্ধাশ্রমে এসেছে যেখানে রয়েছে সন্তানদের দারা অবহেলিত অনেক মা। সেই বৃদ্ধাশ্রমের নাম ‘আপন নিবাস’।

ঢাকার অদূরে উত্তরখান মৈনারটেকে অবস্থিত এই ‘আপন নিবাস’ বৃদ্ধাশ্রম। বর্তমানে এখানে ৪০ জন অসহায় অবহেলিত মা দের বসবাস। আপন নিবাস সম্পর্কে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রম শুধুমাত্র নামেই মাত্র বৃদ্ধাশ্রম আদতে আপন নিবাস কে যদি আপনি মানুসিক এবং প্রতিবন্ধি আবাসস্থল বলেন তবে মোটেও কম বলা হবে না। এখানে ঠাই পাওয়া ৪০ জন মায়েদের মাঝে হাতে গোনা ৫ জন হয়ত মানুসিক ভাবে এবং শারিরিক ভাবে মোটামুটি সুস্থ এছারা বাকিদের মধ্যে দৃস্টি প্রতিবন্ধি হাটা চলা করতে অক্ষম এমন কি বদ্ধ উন্মাদ ও আছে। এমন সব অসহায় নারীদের নিয়ে রাজধানীর উত্তরখান মৈনারটেক এলাকায় সমাজকর্মী সৈয়দা সেলিনা শেলী গড়ে তুলেছেন আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রম।

‘প্রবীণদের জন্য প্রত্যাশিত জীবন চাই’ স্লোগানকে সামনে রেখে ৮ মার্চ ২০১০ সালে ৭ জন অসহায় বয়স্ক নারীদের নিযে যাত্রা শুরু হয়েছিল আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রমের। বর্তমানে বৃদ্ধাশ্রমটিতে বয়সী অসহায় নারীর সংখ্যা ৪০ জন। আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রমটি গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে, উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অর্থায়নে। সরকারি অনুদান ও এনজিওর সাহায্য মেলেনি কখনোই। শুরুতে আশ্রম চলতো মুষ্টিচাল সংগ্রহের মাধ্যমে। মুষ্টিচাল সংগ্রহ করা হতো উত্তরখান ইউনিয়ন ও আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে। ব্যক্তি বিশেষ সহযোগিতার জন্য মাঝে মাঝে এগিয়ে এলেও নিদির্ষ্ট কোনো দাতা নেই। মাসের কোনো একদিন খাবারের দ্বায়িত্ব নেয় কেউ কেউ। কেউ নিয়ে আসেন বৃদ্ধা নারীদের জন্য ফলমূল, কাপড়। আপন নিবাসে যারা থাকেন তাদের কোনো অর্থ-সম্পদ নেই। অসহায় বৃদ্ধা তারা। বেশিরভাগই ছিন্নমূল, হতদরিদ্র বৃদ্ধা, যাদের পরিবার তাদের দেখে না। অনেকের পরিবারই নেই। রাস্তায় অসহায়ের মতো পড়ে থাকে। সেখান থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে।

বৃদ্ধাশ্রমটির প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেলিনা শেলী বলেন, অনেক প্রতিবন্ধকতা এসেছে। বিশেষ করে বাড়ি ভাড়া নিতে হয়েছে। কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চাইছিল না। অর্থও ছিল না। আমার চাকরির কয়টা টাকা মাত্র। সাহায্যকারীও তেমন ছিল না বললেই চলে। শুধুমাত্র নিজ উদ্যোগ ও আমার দলের স্বেচ্ছাসেবী কতগুলো মহিলার সাহায্যে কোনোরকম বাঁচার মতো একটা ব্যবস্থা করেছিলাম। প্রথমে পেট ভরে খাবারের জোগাড় করতেই পারতাম না। যা জোগাড় হতো তাই ভাগ করে খেতাম সবাই। অনেক কষ্ট করেছি আমরা আপন নিবাসকে প্রতিষ্ঠা করতে। কারণ আমাদের কোনো পর্যাপ্ত ডোনার ছিল না। আজও তেমন ভালো ডোনার আমরা পাইনি। অনেক কষ্টেই চলতে হয়।

পৃথিবীর সব দেশেই এই মা শব্দটিই কেবল সার্বজনীন। মা প্রথম কথা বলা শেখান বলেই মায়ের ভাষা হয় মাতৃভাষা। মা হচ্ছেন মমতা-নিরাপত্তা-অস্তিত্ব, নিশ্চয়তা ও আশ্রয়। মা সন্তানের অভিভাবক, পরিচালক, ফিলোসফার, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও বড় বন্ধু। মায়ের দেহে নিউট্রোপেট্রিক রাসায়নিক পদার্থ থাকায় মায়ের মনের মাঝে সন্তানের জন্য মমতা জন্ম নেয়, মায়ের ভালোবাসার ক্ষমতা বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

মানবিক মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রম। আপনিও আপন নিবাসে বৃদ্ধা নারীদের জন্য সামান্য সহায়তা পাঠিয়ে আপনার মানবিক অবদান রাখতে পারেন। সাহায্য পাঠাতে যোগাযোগ করতে পারেন, সৈয়দা সেলিনা শেলী: ০১৮১৬৭৭৯১৬৩।