নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে ছড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা

প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার লাগোয়া উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে ইয়াবা ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মরণ নেশা ইয়াবার ভয়ঙ্কর বিস্তার হওয়ার কারনে এই এলাকায় ইয়াবা পাচারের কদর বেড়েছে। ইতিপূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তাদের প্ররোচণায় আরো নতুন নতুন ইয়াবা ব্যবসায়ী সৃষ্টি হয়েছে। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে নারী পাচারকারীও।

এ নিয়ে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনও রয়েছে বেকায়দায়। মাঝে মধ্যে ইনফরমেশনের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়েও ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের-বাহিরের কিছু সদস্যদের আগাম তথ্য ফাঁসের কারণে এমনটি হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-৬ এর ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এক স্মারকপত্র সূত্রে মাদকদ্রব্য অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) প্রণব কুমার নিয়োগী স্বাক্ষ একটি বিশেষ প্রতিবেদনে স্থান পাওয়া ৭৬৪ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় বান্দরবানের ২৯ জনের নাম পাওয়া গেছে। যার মধ্যে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার রয়েছে ২১জনের নাম। এখানে নাইক্ষ্যংছড়ি সদরের ৯ জন, সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ২জন, ঘুমধুম ইউনিয়নের ১০ জন। গত ছয় বছর আগের এই তালিকার সাথে বর্তমানে যোগ হয়ে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে উপজেলায় শতাধিক ইয়াবা পাচারকারীর নাম।বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের বাণিজ্য কেন্দ্র টেকনাফ ইতিপূর্বে ইয়াবার স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেও সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা রুট পরিবর্তন করেছে।

টেকনাফে ব্যাপক আকারে ধড়পাকড় চললে বর্তমানে এ স্থানের পরিবর্তে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অন্যতম রুট হলো বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি। এ স্থান দিয়ে আগে উল্লেখযোগ্য হারে ইয়াবা আসেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই রুটটি ব্যবহার করা হচ্ছে ইয়াবা পাচারের জন্য। গত কয়েক বছর ধরে নাইক্ষ্যংছড়ি হয়ে ইয়াবা ব্যবসা হলেও সম্প্রতি সময়ে ইয়াবা সেবনকারীর সংখ্যাও বেড়েছে কয়েক গুন। যার মধ্যে রয়েছে চাকরিজীবী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।
আর এ সুযোগে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। টেকনাফের মতো এখানে নেই যত্রতত্র অভিযান, টহল, তল্লাসী এমনকি চেকপোস্টও। এই ধারাবাহিকতায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার চাকঢালা, আশারতলী, সোনাইছড়ি, দোছড়ি, ঘুমধুম ও তুমব্রু সড়ক ব্যবহার শুরু করে ইয়াবা পাচারকারীরা।

স্থানীয়দের তথ্য মতে জানা যায়, মায়ানমার থেকে পার হয়ে সীমান্ত ঘেঁষা এলাকার নারী-পুরুষের সহযোগিতা নেন পাচারকারীরা। এরপর বিশেষ করে মোটরসাইকেল, সিএনজি, মাইক্রোবাস, চাদের গাড়ি, রিক্সা এমনকি কাঠ বোঝাই ট্রাকে যাত্রী ও কর্মজীবী সেজে এসব ইয়াবা পাচার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল ও সড়ক পরিবর্তন করে থাকে। যেমন-চাকঢালা, আশারতলী সীমান্ত থেকে আসা ইয়াবা নাইক্ষ্যংছড়ির কলেজ রোড়, রেস্ট হাউজ রোড়, সোনাইছড়ি রোড়, রূপনগর রোড় ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে রামু উপজেলার মৌলভীরকাটা, কচ্ছপিয়া-গর্জনিয়া ও শাহ সুজা সড়ক হয়ে পাচার হয়। সীমান্তের নিকুছড়ির পাশ দিয়ে আসা ইয়াবা আমতলীমাঠ, চাকঢালাসহ সোনাইছড়ি-ভগবান টিলা-বটতলী ও মরিচ্যা হয়ে পাচার হয়। দোছড়ি থেকে প্রবেশ হয়ে আসা ইয়াবা তিতারপাড়া-কচ্ছপিয়া বাইশারী রোড় ও নাইক্ষ্যংছড়ি প্রধান সড়ক দিয়ে পাচার এবং ঘুমধুম-তুমব্রু থেকে প্রবেশ হওয়া ইয়াবা প্রধান সড়ক ছাড়াও গ্রামের সুরু পথ হয়ে পাচার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।

এসব পয়েন্ট হয়ে আসা ইয়াবা চাকঢালা বাজার, আশারতলী ব্রিজ, চেরারমাঠ, নাইক্ষ্যংছড়ি থানা মোড়, উপজেলা পরিষদ চত্বর, সোনাইছড়ি বটতলী, নাইক্ষ্যংছড়ি মসজিদঘোনা, বিছামারা, রূপনগর, জারুলিয়াছড়ি, কচ্ছপিয়ার তুলাতলী স্টিল ব্রিজ, সিকদারপাড়া-শাহসুজা সড়ক, মৌলভীরকাটা, তিতারপাড়া, রামুর বাইপাস, রাবার বাগান এলাকা থেকে ইয়াবা বণ্টন করে থাকে। উল্লেখিত এলাকা থেকে পরিবহনযোগে ইয়াবা পাচারের সময় একাধিক মোটরসাইকেল, সিএনজির মাধ্যমে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করে পাচারকারীদের নিকট মোবাইল ফোনে আগাম সংবাদ পৌঁছে দেয়। এ কাজে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু ব্যক্তিসহ বিভিন্ন চেকপোস্টের কর্মচারী, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স, কিছু ব্যবসায়ীর নাম জড়িয়ে পড়েছে সম্প্রতি সময়ে।

উল্লেখিত এলাকা থেকে ইয়াবা বণ্টন হওয়ার পর ইয়াবার বড় চালান এলাকাভিত্তিক দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য চট্টগ্রাম, চকরিয়া, রামু, কক্সবাজার ও টেকনাফের বেশ কিছু ইয়াবা ব্যবসায়ীর সাথে নাইক্ষ্যংছড়ির নব্য ইয়াবা পাচারকারীদের মধ্যে গড়ে উঠেছে সখ্যতা। রাঘব বোয়াল ব্যবসায়ীরা নাইক্ষ্যংছড়ির পাচারকারীদের অগ্রিম টাকা দিয়ে ইয়াবা ব্যবসায় যোগান দিচ্ছে।

ইতিপূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ২১ জন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সম্প্রতি সময়ে এসব ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে দেন দরবারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মডেলের নিত্য নতুন মাইক্রো, নোহা, কার ও মোটর সাইকেলের আনাগুনা বৃদ্ধি পেয়েছে নাইক্ষ্যংছড়িতে। এসব গাড়িগুলোতে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতাদেরও দেখা মেলে। যার কারনে অনেক সময় নেতার ভয়ে সড়ক পথে কোথাও এসব পরিবহন তল্লাশি করেনা স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সচেতন একাধিক বাসিন্দা জানান, নাইক্ষ্যংছড়ির বহু পরিচিত মুখ ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েছে। যাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে রাতারাতি হয়েছে পরিবর্তন। তবে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে প্রশাসনের নিশ্চুপ ভূমিকা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সোর্সরা মাঝেমধ্যে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও প্রশাসন শতভাগ নিশ্চয়তা ছাড়া অভিযান চালাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আবার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু দুষ্কৃতিপরায়ন কর্মকর্তা গোপনে সেসব ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে দেনদরবার শুরু করেন।

বর্তমানে নাইক্ষ্যংছড়িতে ইয়াবা ব্যবসার সাথে জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার, ইলেক্সট্রিক্স ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তি, হুজুর, কাঠ ব্যবসায়ী, ফার্মেসী ব্যবসায়ী, মোটরসাইকেল চালক, বাগান মালিক, মোবাইল দোকানদার, চাকুরিজীবী, ঔষধ কোম্পানীর এমআর, রিক্সা-ভ্যান চালক, বেকার যুবক, সেলসম্যান, সমাজের অনেক সম্মানী ব্যক্তিসহ নুতন পুরাতন অন্তত শতাধিক ইয়াবা পাচারকারী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। যারা নিজেদের পূর্বেকার পেশার আড়ালে বর্তমানে মরণ নেশা ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েছে।

সচেতন নাগরিকরা জানান, ইয়াবা পাচারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে আর প্রকাশ্যে ব্যবসা করছে তা দিবালোকের মত সত্য। কিন্তু প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় পশ্রয়ে থাকা সেসব ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দেওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে চিহ্নিত পাচারকারীদের নজরদারী ও তল্লাশি করা হলে আতঙ্কে যত্রযত্র ইয়াবা পাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন।

এ ব্যাপারে বান্দরবান জেলা পুলিশের এক পদস্থ কর্মকর্তা জানান- বিশ্বাসযোগ্য কোন তথ্য না পেলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে যেকোন ব্যক্তিকে আটক করা দুষ্কর। তাই স্থানীয় মানুষদের আরো সচেতন হয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে। এরপরও পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য উদঘাটন ও সড়ক তল্লাশি করে বিপুল ইয়াবাসহ অসংখ্য পাচারকারীদের আটক করা হয়েছে।

 

সোহেল কান্তি নাথ, বান্দরবান প্রতিনিধি