কুড়িগ্রামে আগাম নদী ভাঙ্গন, স্বেচ্ছাশ্রমে এলাকাবাসীর বাধ নির্মাণ 
জেলার ধরলা নদীর তীরের বাসিন্দা গৃহকর্মী কবিরণ বেওয়ার আকুতি করে বলছিলেন ‘বাঁধটা মেরামত না হইলে হামার ঘর-বাড়ি বানের পানিত ভাসি যাইবে। সেই জন্যে মানুষের বাড়িত কাম করিয়া মজুরি নিয়া তারে থাকি ১০০ টাকা চাঁন্দা দিছি। আজ ঘরোত খাবার নাই। তাও যেন বাঁধটা ভালো হয়’।
বিধবা কবিরণের মত  স্থানীয় বৃদ্ধ দিনমজুর সদর আলীও ১০০ টাকা চাঁদা দিয়ে শরিক হয়েছেন বাঁধ মেরামতের কাজে। গত বছরের বন্যায় তিনি ৩২ ঘন্টা খড়ের ঢিপি আর গাছ আঁকড়ে ধরে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলাম।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত বন্যায় কুড়িগ্রাম সদর হলোখানায় ধরলার ভয়াল বন্যায় ভেঙে যাওয়া সারডোব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটির ৪শ’ মিটার অংশ এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রম ও অর্থে মেরামতের কাজ চলছে। গ্রামের বিভিন্ন বয়সী মানুষ মেরামত কাজে নেমে পড়েছে। নিজেরা মাটি কাটা ছাড়াও দ্রুত কাজটি করার জন্য নদীতে ড্রেজার মেশিন লাগানো হয়েছে। নদীর তীর ঘেঁষে ঝুলছে একটি ব্যানার। বাঁধটি সুন্দরভাবে মেরামত করার জন্য গ্রামবাসীরা একটি কমিটি গঠন করেছে।
কমিটির সভাপতি আশরাফ হোসেন জানান, গত বছরের ১২ আগষ্ট ধরলা নদীর তীরবর্তী সারডোব ও বড়ভিটা এলাকায় বাঁধটির ১ হাজার ২০০ মিটার অংশ ভেঙে যায়। বাঁধের উপর দিয়ে তৈরী করা পাকা সড়ক দিয়ে ফুলবাড়ী সদরের সাথে যাতায়াত করতো মানুষ। ফলে বাঁধটি ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা। কয়েকশ ঘর বাড়ি ও দোকান বিলীন হয়ে যায়। বালুর আস্তরণ পরে ঢেকে যায় আবাদি জমি।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুম আসলেও এখনও বাঁধ ও রাস্তাটি মেরামতের কোন উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে বাঁধের ভাঙা অংশ ঘেঁষে ধরলার মুল স্রোত প্রবাহিত হওয়ায় শুরু হয়েছে ভাঙন। ফলে ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার আশঙ্কা করছে বন্যা ও ভাঙনের কবলে পড়ার। এলাকাবাসী মানববন্ধন ও সমাবেশসহ অনেক চেষ্টা করেও কোন কাজ হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা এনামুল হক জানান, বন্যার পর প্রধানমন্ত্রী এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রীসহ কর্মকর্তারা বাঁধ দ্রুত মেরামতের আশ্বাস দিলেও কোন কাজ হয়নি।
জানা গেছে, গত ২৫ এপ্রিল ধরলার পারে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধন করার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা ৪০০ মিটার অংশ নিজেদের উদ্যোগে মেরামত করলে বাকী অংশ মেরামতের আশ্বাস দেন। সে অনুযায়ী তারা মেরামত শুরু করেছেন। গত ২৮ এপ্রিল এই মেরামতের কাজ শুরু হয়। গ্রামের লোকজন শ্রম ছাড়াও সাধ্যানুযায়ী চাঁদা দিয়ে কাজটি এগিয়ে নিচ্ছেন।
বাঁধের পাশের বসতি ছিল সজদ্দি মামুদের। বাঁধটি মেরামতের স্বার্থে তিনি সরিয়ে নিয়েছেন ঘর। একইভাবে জহুর আলী, এনদাল ও খয়বর ঘর ও বাঁশঝাড় সরিয়ে বাঁধ মেরামতে সহায়তা করছে। স্থানীয় যুবক একরামুল ও জুয়েল ও মিঠু জানান, এলাকার সব শ্রেণির মানুষ বাঁধ মেরামতের কাজে যে যেভাবে পারে অংশ নিচ্ছে। স্বেচ্ছাশ্রমের এক বড় দৃষ্টান্ত হয়েছে একই কাজটি।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, বর্ষা আসন্ন। অথচ অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধটি মেরামত করতে পারছে না। তাই গ্রামবাসীরা নিজেদের ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি রক্ষা করতে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধটির অংশ বিশেষ মেরামত করছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: শফিকুল ইসলাম জানান, জমি নিয়ে জটিলতা থাকায় দ্রুত মেরামতের স্বার্থে ৪০০ মিটার অংশ গ্রামবাসীরা নিজ উদ্যোগে মেরামত করছে। অর্থ বরাদ্দ না পেলেও জরুরি তহবিল থেকে বাকী ভাঙা অংশগুলো দ্রুত মেরামত করা হবে। এছাড়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।
মোঃ মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি