মে দিবসের ইতিহাস প্রতিবাদী শ্রমিকদের ইতিহাস। সারা বিশ্বের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের অনন্য ইতিহাস। দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমসময়ের দাবি, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও কর্ম পরিবেশ উন্নততর করার দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন ১৮৮৬ সালের এই দিনে।

শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে ক্ষোভ আর উদ্বেলিত কণ্ঠে বিশাল শ্রমিক জমায়েত ও বিক্ষোভ হয়েছিল। তিলঠাঁই শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে সেদিন শ্রমিক সমাবেশে গুলি চালায় রাষ্ট্র। পুলিশের গুলিতে  ১১ জন লড়াকু শ্রমিক তাজা প্রাণ দিয়েছেন। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল সমস্ত যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে। তীব্র আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি তখন মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। শ্রমিকরা বিজয়ী হন। সেই থেকে পৃথিবীতে মে দিবস আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের পাশাপাশি পুঁজিবাদী দেশসমূহেও পালিত হয় অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনের শপথ।

 

আমাদের দেশেও যুগে যুগে বিভিন্ন ইস্যুতে শ্রমিক আন্দোলন দানাবেঁধেছে। কোনটা সফল হয়েছে কোনটা হয়নি। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে শ্রমিক আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। দেশের মানুষের শোষণ মুক্তির আন্দোলন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন ও স্বাধিকারের আন্দোলন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় আরেকবার।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশে শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন ছিল। ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক  শ্রমিক সংগঠনগুলিও রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে যায় মূলস্রোত হারিয়ে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পুঁজিবাদী সমাজের একাত্ত্বতা। লাভবান হতে থাকে বিশেষ গোষ্টি ও বিশেষ ব্যক্তি। অনেকটা এমন যেখানে ধনীরা ধনি হবে আর গরিবেরা আরো গরিব হতে থাকবে। বৈষম্যের মাত্রা এতটাই চরমে পৌঁছেছে, যেখানে শ্রমিকদেরে এখনো প্রতিনিয়ত অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়। লাশ হতে হয় কর্মক্ষেত্রে। তবুও সংগ্রামী জীবনের গ্লানী টেনেই যাচ্ছেন বাংলার শ্রমিক সমাজ।

 

১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর সামরিক শাসন জারি হলে শ্রমিকরাই প্রথম সংগঠিত হয়। কিন্তু এরশাদের সামরিক শাসনে শ্রমিক সংগঠনগুলি শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে যৌথ আন্দোলন গড়ে তুলেও প্রতিবাদের পথে বেশি দূর এগোতে পারেনি। বহু চেষ্টার পরেও স্রোত যেন বাটিতে হারিয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় একীভূত শক্তির কারনে যখনই রাজনৈতিক দলসমূহের আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়েছে, তখনই হয় শ্রমিক আন্দোলন, না হয় ছাত্র আন্দোলন রাজপথের শূন্যতা পূরণ করেছে। সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনেও শ্রমিক নেতারা আত্মাহুতি দিয়েছেন। তবুও আন্দোলন চলছে স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৬ বছর পরেও।

আন্দোলনের উৎস যে দেশ, যেখান থেকে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইটা শুরু হয়েছিল-সে দেশটিতে ১লা মে তেমন একটা পালন হয় না। যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার পালিত হয় ‘লেবার ডে’ হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের লেবার ডে-তে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। এ নিয়ে শ্রমিকদেরও তেমন উচ্চবাচ্যে নেই। পালন করা হয় সরকারি ছুটি আর ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা মূল্যছাড়ের উৎসবের মধ্য দিয়ে। ১ মে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি স্বাভাবিক কর্ম দিবস।

মে দিবস কি? এই প্রশ্ন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে কর্মরত নানান পেশার কয়েকজন শ্রমিককে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ছাপা হয়েছে তাদের কথা। অনেকেই মে দিবসের প্রশ্ন শুনে বিভ্রমে পড়েন। ভারতীয় অভিবাসী ২৭ বছর বয়সী গোরবিন্দ পাল সিং পাঁচ বছর ধরে একটি ফাস্ট ফুড দোকানে কাজ করছেন। বর্তমানে ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা গোরবিন্দ এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘আমি কোনো দিন মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের কথা শুনিনি। আমার ক্যালেন্ডারে পর্যন্ত মে দিবস সম্পর্কে কিছু লেখা নেই। লেবার ডের কথা জানি। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার লেবার ডে পালন করা হয়। ওই দিন আমাদের দোকানও বন্ধ থাকে।

সালভাদরের অভিবাসী ৩২ বছরের হুজে ইউপিএস-এর গাড়ি চালান ১২ বছর ধরে। কারিগরি একটি বিষয়ের ওপর ডিপ্লোমা করা হুজে বলেন, ‘আমার দেশে অথবা এখানে কেউ কোনো দিন এই বিষয়ে বলেনি। দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ করে এতটা খোঁজ রাখতে পারি না—বলেই গাড়ি চালাতে শুরু করেন তিনি।

চীনা বংশোদ্ভূত ৪০ বছর বয়সী চ্যাং ১৭ বছর বয়সে কাজ শুরু করেছিলেন। এখানকার কলেজ থেকে পড়া-লেখা শেষ করে গত ১৪ বছর ধরে নিউইয়র্ক পুলিশে কাজ করছেন। এই প্রশ্নের উত্তরে চ্যাং বলেন, ‘এই প্রথম কোনো ব্যক্তি আমার সঙ্গে এই বিষয়ে আলাপ করেছে। আমি এখন মে দিবস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব।’

ম্যাক্সিকান অভিবাসী ৫২ বছরের নারী নিকোলাস রাতের শিফটে ট্যাক্সি চালান। এর আগে নানান পেশায় কাজ করা নিকোলাস বলেন, ‘আমি মে দিবসের কথা শুনেছি, কিন্তু এ বিষয়ে কিছু জানি না।’

বাংলাদেশি অভিবাসী ৩৭ বছর বয়সী শাহিন আক্তার পাঁচ বছর ধরে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো দিন মে দিবসের কথা শুনিনি। বাংলাদেশে থাকতে দেখেছি, কমিউনিস্টরা মে দিবস পালন করত। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানি না। তবে আমার মনে হয় শ্রমিকেরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য এবং ন্যায্য মজুরি পাওয়ার জন্য এই দিবস পালন করে থাকে।’

বাংলাদেশেও মে দিবস পালিত হয় যথাযত ভাবে। এবারের মে দিবসে আমাদের দাবি হোক শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী স্বীকৃত অধিকারসমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হোক। শুধু কথায় নয়, বাস্তবে উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশের শ্রমিকরাও যেন তাদের শ্রম ও আত্মমর্যাদার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আর যেন রানা প্লাজা, ইউনিক, তাজরীন বা স্পেকট্রাম-এর মতো লোভীমানবসৃষ্ট দানবের দ্বারা শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন না হয়। শ্রমিকরা যেন তাদের অধিকার আদায়ের মাধ্যমে মনে করতে পারে ‘আমিই এদেশের উন্নয়নের কারিগর, আমার শ্রম-ঘামেই দেশ এগিয়ে চলেছে।

মহান মে দিবস আমাদের শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে। শ্রমিকের শ্রম-ঘামে উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন তাদের যেভাবে শোসন করা হতো, তা অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। তবে এখনো এসব বিষয়ে আজও সচেষ্ট হতে হবে। সরকার পোশাক শ্রমিকসহ অন্যদের জন্য নূন্যতম যে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা যথাযথ মানা হচ্ছে কি না তা দেখতে হবে। মহান শ্রম দিবসের এই ক্ষণে শ্রমিকদের অধিকার শতভাগ বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছি।