‘এইসব কথা আপনাগো কইয়া লাভ নাই’, কাকে বলবে তারা? 

মঙ্গলবার ১ মে সকাল আনুমানিক সোয়া ৭টায় রাজধানীর আজিমপুর বাসষ্ট্যান্ড থেকে পশ্চিমদিকগামী রাস্তার অদূরে ফুটপাতে বসে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মজুরি বৈষ্যমের কথা জানাচ্ছিলেন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা দিনমজুর সুফিয়া। সুফিয়া বলেন, ‘কেডায় কয় বেডা আর বেডিগো সমান অধিকার, কিন্তু কামের মজুরির বেলায় আমাগোরে দেয় পুরুষের মাইনষের অর্ধেক ট্যাহা। সারাদিন কাম কইরা যহন অর্ধেক মজুরি দিয়া পুরা মজুরির সই লয়, হেই বেলা মনে হয় বেডাগুলারে কোবাই।’

আজ মহান মে দিবস। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে শত বছর আগে আন্দোলন শুরু হলেও আজও শ্রমিকরা, বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সুফিয়ার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আরেক নারী শ্রমিক বললেন, ‘বছরের পর বছর একটাই কথা হুনি, মাইয়া মানুষে কাম পারে না। এই কারণ দেহাইয়া বেডাগোরে ৭০০ টাকা দিলে আমাগোরে দেয় ৩৫০ টাকা। এইডা কেমুন বিচার? এইসব কথা আপনাগো কাছে কইয়া লাভ নাই, ফজরের ওয়াক্তে ঘুম থাইক্যা উইঠা না খাইয়া আইছি। কথা কইতেও কষ্ট লাগতাছে।’

'এইসব কথা আপনাগো কইয়া লাভ নাই', কাকে বলবে তারা?  ১

সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা গেছে সাত সকালেই তরুণী ও মধ্যবয়সী নারী দিনমজুররা কাজের সন্ধানে ফুটপাতে বসে অপেক্ষা করছেন। আজ মে দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকলেও তাদের কপালে ছুটি নেই। প্রতিদিন গতর খাটিয়ে কাজ করলে ভাত জোটে, না হলে অভুক্ত থাকতে হয়।

সালমা খাতুন নামে এক নারী শ্রমিক জানান, দেরি করলে কাজ পেতে কষ্ট হতে পারে এ আশঙ্কায় কাকডাকা ভোরেই বাইরে বের হয়েছেন। শুধু সুফিয়া বা সালমা নন, নুরজাহান, তারাবানু, হুসনে আরাসহ উপস্থিত সব নারী শ্রমিক একই সুরে কথা বললেন। তারা জানান, ঈদ, পার্বন, অসুখ বিসুখ ছাড়া তারা প্রতিদিনই কারও না কারও কাছে শ্রম বিক্রি করেন। দুঃখভরা কণ্ঠে জানালেন, তারা সরাসরি কাজ পান না। তাই মজুরি অর্ধেক পান। এলাকার প্রভাবশালী ঠিকাদাররা ভবন মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করে বিভিন্ন এলাকায় তাদের কাজে নিয়ে যান। সাধারণত সকাল ৯টা/১০টা থেকে আসরের নামাজের আজান পর্যন্ত কাজ করেন। অনেক সময় বাড়তি কাজ করলেও ওভারটাইম পান না।

আজ ১ মে শ্রমিক দিবস তা জানেন কিনা জানতে চাইলে রহিমা নামের এক নারী শ্রমিক বলেন, ‘আমরা হগলেই এ দিনের কথা জানি। এদিন শ্রমিকদের ছুটি থাকে এইডাও জানি। কিন্তু আমাগো মতো যারা দিন আনি দিন খাই তাগো লাইগ্যা ১ মে আর ১ ডিসেম্বর একই, কাম না করলে পেডে ভাত জুটবো না।’

সকাল সাড়ে ৬টা। বিজিবি ৩ নম্বর গেটের সামনে থেকে পূর্বদিকের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিলেন পঞ্চাশোর্ধ এক ব্যক্তি। এগিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতেই বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘কি কইবেন তাড়াতাড়ি কন, কামে যামু’। নুরুল ইসলাম নামে ওই ব্যক্তি জানান, এখন আর আগের মতো কাজ পাওয়া যায় না।

কারণ জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘সরকারি দলের পাতি নেতারা দেশগ্রাম থাইক্যা দিনমজুর আইন্যা ভরাইয়া ফালাইতাছে। দিনে কাম করায়, লাগলে নেতাগিরিও করতে মিছিলে মিটিংয়ে কাজে লাগায়। এই কারণে অনেক দিনমজুর কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।’

নুরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তারা দৈনিক ৭০০ টাকা মজুরি পেলেও ঠিকাদার একাধারে সরকারি দলের পাতি নেতারা ১০০-১৫০ টাকা কমিশন কেটে রাখেন।