‘নারীর ক্ষমতায়নের বাংলাদেশ এখন রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত’

নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের জন্য শেখ হাসিনাকে এ সম্মেলনে গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০১৮ প্রদান করা হয়। বিশ্বে নারীর ক্ষমতা কাজে লাগাতে একটি নতুন বৈশ্বিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুক্রবার অস্ট্রেলিয়ায় গ্লোবাল সামিট অব উইমেনে (নারীদের বৈশ্বিক শীর্ষ সম্মেলন) দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ লক্ষ্য পূরণে চার দফা প্রস্তাবও দেন। 

সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি এই পুরস্কার পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করছি। এই পুরস্কার উৎসর্গ করছি বিশ্বের নারীদের, যাঁরা পরিবর্তনের চেষ্টায় নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন।’ তিনি বলেন, ‘নারী চেঞ্জ মেকারদের দেখতে পাওয়া আমার জন্য বিশাল আনন্দের বিষয়।’ মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারের জন্য তাঁকে মনোনীত করায় তিনি গ্লোবাল সামিট অব উইমেন কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

মিলনায়তনে উপস্থিত নারী অধিকার কর্মী, বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নারীদের সহায়তায়, তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমাদের একটি নতুন জোট গঠন করতে হবে। লাখ লাখ নারীর স্বার্থে আমাদের অবশ্যই অভিন্ন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ নিয়ে একত্রে কাজ করতে হবে।’

স্বাধীনতার পর থেকে নারীর ক্ষমতায়নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে অগ্রগতি হয়েছে, সেসব তথ্য তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের বাংলাদেশ এখন রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।’ তিনি ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশি নারীদের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশি নারীরা ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নারীর মর্যাদা এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমরা তাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছি।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের সব স্তরে পুরুষের পাশাপাশি সম-অধিকার দিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নে তাঁর সংগ্রাম ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, পরিবারের ১৮ জন সদস্যসহ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি ও তাঁর বোনকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। সে সময়ে তাঁরা বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। ছয় বছর তাঁদের বিদেশে নির্বাসিতজীবন কাটাতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে এসে তিনি জনগণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর দল ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর জনগণের কল্যাণে অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। এসব কর্মসূচির সুফলের জন্য জনগণ ২০০৮ সালে ও ২০১৪ সালে তাঁর দলকে পুনরায় নির্বাচিত করে। দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকায় সুষ্ঠু, অধিকারভিত্তিক, লিঙ্গ সংবেদনশীল এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৭ সালের প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের দিক দিয়ে বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৫৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।

বিশ্বে নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্য পূরণে শেখ হাসিনা চারটি প্রস্তাব এ সম্মেলনে তুলে ধরেন। এগুলো হলো—১. নারীর সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত যে ধারণা সমাজে রয়েছে, তা ভাঙতে হবে। ২. প্রান্তিক অবস্থানে ঝুঁকির মুখে থাকা সেসব নারীর কাছে পৌঁছতে হবে, যারা আজও কম খাবার পাচ্ছে, যাদের স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না, যারা কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে এবং সহিংসতার শিকার হচ্ছে।  কোনো নারী, কোনো মেয়ে যেন বাদ না পড়ে। ৩. নারীদের উত্পাদনক্ষমতা বাড়াতে তাদের সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে এবং ৪. জীবন ও জীবিকার সব ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নারীশিক্ষার উন্নয়ন এবং ব্যাবসায়িক উদ্যোগে ভূমিকার জন্য শেখ হাসিনাকে এবার এই পুরস্কার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল সামিট অব উইমেন। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার আগে নৈশভোজের পর তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র দেখানো হয় সম্মেলনে। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী উপস্থিত ছিলেন। অস্ট্রেলিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানানোয় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলকেও ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা।