তদন্ত রিপোর্ট পেশ, দায়ী স্টেশন মাস্টার 

বৃহস্পতিবার ‘জামালপুর কমিউটার’ ট্রেন দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দায়ী করা হয়েছে মূলত টঙ্গী স্টেশন মাস্টারকে। বলা হয়েছে, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত পয়েন্ট ও সিগন্যাল তৈরি না করেই টঙ্গী স্টেশন মাস্টার আবদুর রাজ্জাক জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটিকে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দেন। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে পয়েন্টম্যান ও সিগন্যালম্যানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও রিপোর্টে ওঠে এসেছে।

সকালে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেনের কাছে দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে স্টেশন মাস্টারসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের চরম অবহেলার বিষয়টি ওঠে এসেছে। এছাড়া নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা ঠেকানো নিশ্চিত করতে প্রতিবেদনে ৮ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এতে ঠিক কী আছে, তা বিস্তারিত জানা যায়নি। অবহেলাজনিত দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ কঠোর শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। ছাদে যাত্রী ওঠাসহ অনিয়ম ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানার বিষয়টি মাথায় রেখে প্রয়োজনে রেলের আইনের কিছু ধারা পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে।

রোববার দুপুরে জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ‘জামালপুর কমিউটার’ ট্রেনটি টঙ্গী জংশন পার হওয়ার সময় হঠাৎ লাইন পরিবর্তন হওয়ায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ট্রেনটির ১২টি বগির মধ্যে সাতটি লাইনচ্যুত হয়। এতে ঘটনাস্থলে তিনজন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরও একজনের মৃত্যু হয়। এতে প্রায় অর্ধশত যাত্রী আহত হন।

দুর্ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পয়েন্ট তৈরি এবং সিগন্যাল ত্রুটির কারণে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন। ওইদিন বিকালে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী চন্দন কান্তি দাশকে প্রধান করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কথা হয় তদন্ত কমিটির প্রধান চন্দন কান্তি দাশের সঙ্গে। তিনি রেলের মহাপরিচালকের কাছে রিপোর্ট দেয়ার কথা স্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ আমরা উদ্ঘাটন করতে পেরেছি।

কমিটির অপর এক সদস্য জানান, মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনা ছিল তদন্ত রিপোর্ট যেন যথাযথ হয়। ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার জন্য দায়ী করা হয়েছে সেদিন দায়িত্বরত টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ছাড়াও সংশ্লিষ্ট আরও ৪ জনকে। তিনি বলেন, ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা ও ওই অবস্থায় ট্রেন ছাড়ার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। জানতে চাইলে রেলের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ট্রেন দুর্ঘটনা আমাদের জন্য খুবই লজ্জা ও অপরাধেরও। ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ফলে ৪টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে, আহত হয়েছেন অনেকে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, রিপোর্টটি আমরা দেখেছি। রিপোর্ট অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার জন্য টঙ্গীর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবদুর রাজ্জাককেই দায়ী করা হয়েছে।

মূলত তার গাফিলতি ও ভুলের জন্যই এটা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। রিপোর্টে বেশকিছু সুপারিশ থাকার কথা উল্লেখ করে আমজাদ হোসেন বলেন, সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করে দিয়েছি আমরা। রিপোর্ট অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়ে রেল সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন জানান, রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীর অবহেলা বা ত্রুটির কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।

রেলপথ সবচেয়ে নিরাপদ বাহন, কোনো ব্যক্তির কারণে তা অনিরাপদ হতে পারে না। তিনি বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তদন্ত রিপোর্টে যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা-ও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।