ছাত্রলীগের ২৯তম সম্মেলনকে ঘিরে নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে যারা

বহু আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া দেশের প্রাচীনতম ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যেন ঘুম নেই পদপ্রত্যাশী নেতাদের চোখে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কড়া নির্দেশে সম্মেলনে তারিখ ঘোষণা হয়েছে ছাত্রলীগের। এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে সংগঠনের নতুন নেতৃত্বে কারা আসছেন।

দুই বছর ৭ মাস আগে ২০১৫ সালের ২৬ ও ২৭ জুলাই সর্বশেষ সম্মেলনে প্রত্যক্ষ ভোটে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসেন সাইফুর রহমান সোহাগ ও জাকির হোসাইন। ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে ছাত্রলীগ। আত্মপ্রকাশের পর বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় সংগঠনটি। সংগঠনের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীর চাপের মুখে গত মাসে নতুন কাউন্সিলের ঘোষণা দেয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ বর্তমান কমিটি। তারপর থেকেই ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণকারী কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ শুরু করে পদপ্রত্যাশী নেতারা। বিশেষ করে যাদের বয়স এখনো আছে, তাদের দৌড়ঝাঁপ লক্ষ্য করার মতো।

তবে ছাত্রলীগের কাউন্সিলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বলছে, পরিশ্রমী ও মেধাবী এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে জনপ্রিয়, পরিচ্ছন্ন ইমেজ, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতারা এগিয়ে থাকবেন। বিশেষ করে বিগত দিনগুলোতে যারা সরাসরি মাঠে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, তারাই এগিয়ে থাকবে পদ পাওয়ার দৌড়ে। টেন্ডারবাজ ও নানা অপকর্মে জড়িতদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ নেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে ওই নেতারা জানান, যেহেতু সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তাই এমন নেতা নির্বাচন করা হবে যাতে নির্বাচনকালীন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনারও নির্দেশনা রয়েছে, বিতর্কিতরা যেন ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে না অাসতে পারে।

সম্মেলনে সংগঠনটির শীর্ষ পদগুলো পেতে শুরু হয়েছে পদ প্রত্যাশীদের চেষ্টা তদবির। নেতৃত্বে আসতে দুঃসময়ে সংগঠনের জন্য ত্যাগ এবং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রচারণা সামনে আনছেন তারা।

ঐতিহ্য অনুযায়ী, ছাত্রলীগের সম্মেলনে নেতৃত্ব নির্বাচনে কয়েকটি বিষয় দেখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- পারিবারিক পরিচিতি, নিয়মিত ছাত্রত্ব, সংগঠনের জন্য ত্যাগ এবং এলাকা।

গত কয়েকটি সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে (কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) রাখা হয়েছে। এছাড়া বরিশাল এবং ফরিদপুর অঞ্চল থেকে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইজন নেতৃত্ব থাকে।এর বাইরের অন্যান্য অঞ্চল থেকে দুইজন নেতৃত্ব আসছেন। এবারের সম্মেলনকে ঘিরে এই হিসেব ধরেই আগাচ্ছেন প্রার্থীরা।

২৯তম জাতীয় সম্মেলনে (কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) নেতৃত্ব নির্বাচনে অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি এলাকার বিষয়টি বিশেষ প্রাধান্য পাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বৃহত্তর বারিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গ ও ফরিদপুর অঞ্চল আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

এছাড়া বৃহত্তর খুলনা, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকেও নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনায় আসছে। এছাড়া সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতাকে এবারের সম্মেলনে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সর্বশেষ বরিশাল অঞ্চল থেকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রে শীর্ষ নেতৃত্ব এসেছে দুই যুগ আগে, সেই ১৯৯৪ সালে। সে বছর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে এ কে এম এনামুল হক শামীমকে সভাপতি (ফরিদপুর অঞ্চল) এবং ইসহাক আলী খান পান্নাকে (বরিশাল অঞ্চল) সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে প্রায় নিয়মিত এই অঞ্চল থেকে নেতৃত্বে এলেও এবছর কেন্দ্রের নেতৃত্বে এ অঞ্চলটিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে ছাত্রলীগে জোর আলোচনা আছে।

এরপরই আলোচনায় রয়েছে উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রাম অঞ্চল। সর্বশেষ ছাত্রলীগের ২৬তম সম্মেলনের মাধ্যমে ২০০৬ সালে উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে নেতৃত্ব আসে। তখন উত্তরবঙ্গ থেকে মাহমুদুল হাসান রিপনকে সভাপতি ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

এরপর ২৭ ও ২৮তম জাতীয় সম্মেলনে এই দুটি অঞ্চল থেকে আর নেতৃত্ব আসেনি। ফলে এবারের সম্মেলনের প্রার্থী নির্বাচনে এই দুটি অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া ২৭তম সম্মেলনে বৃহত্তর খুলনা ও ময়মনসিংহ অঞ্চল এবং ২৮তম জাতীয় সম্মেলনে ফরিদপুর ও সিলেট অঞ্চল থেকে নেতৃত্ব এসেছে। ফলে এবারের সম্মেলনে খুলনা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চল থেকে নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

তবে পূর্বের ঐতিহ্য অনুযায়ী ফরিদপুর থেকে একজন নেতৃত্বে আসবেন বলে মনে আলোচনা আছে ছাত্রলীগে।

ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১৫ সালের ২৫ ও ২৬ জুলাই। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে সাইফুর রহমান সোহাগকে সভাপতি ও এসএম জাকির হোসাইনকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।

এর আগে ১১ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সম্মেলন শেষে ১৮ জুন আবিদ আল হাসানকে সভাপতি এবং মোতাহার হোসেন প্রিন্সকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

ওই বছরের ২৮ মে ঢাকা মহানগর উত্তরের সম্মেলন শেষে ৩০ মে মিজানুর রহমানকে সভাপতি ও মহিউদ্দিন আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে শাখাটির ছয় সদস্যের কমিটি করা হয়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণে ৩০ মে সম্মেলন শেষে ওই দিনেই বায়েজিদ আহমেদ খানকে সভাপতি ও সাব্বির হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে শাখাটির আট সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর এবং জেলা কমিটির মেয়াদ এক বছর। সেই হিসাবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ।

এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিসমূহের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেছে ছাত্রলীগ।

৫ এপ্রিল ছাত্রলীগের করা সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা অনুযায়ী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন হবে আগামী ১১ ও ১২ মে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, উত্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলন হবে যথাক্রমে ২৪, ২৬ ও ২৯ এপ্রিল।

আলোচনায় যারা

২৯তম সম্মেলনে বরিশাল অঞ্চল থেকে আলোচনায় আছেন- কেন্দ্রীয় আইন সম্পাদক ও ঢাবির শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আল-নাহিয়ান খান জয়, কৃষি শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বরকত হোসেন হাওলাদার, ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক ইয়াজ আল রিয়াদ, আপ্যায়ন বিষয়ক উপসম্পাদক আরিফুজ্জামান আল ইমরান, সহ-সম্পাদক খাদেমুল বাশার জয়, সহ-সম্পাদক সবুর খান কলিন্স, প্রচার বিষয়ক উপ-সম্পাদক সাইফুর রহমান সাইফ, সহ-সম্পাদক মো. আরিফুল ইসলাম সোহাগ।

চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আলোচনায় রয়েছেন: কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আদিত্য নন্দী, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শামীম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ সম্পাদক এইচ এম তাজউদ্দিন, স্কুল ছাত্রবিষয়ক উপ-সম্পাদক সৈয়দ আরাফাত, স্কুল ছাত্রবিষয়ক উপ-সম্পাদক খাজা খায়ের সুজন, সহ-সম্পাদক জায়েদ বিন জলিল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহাসান আহমেদ রাসেল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ লিমন, স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষার প্রমুখ।

উত্তরবঙ্গ থেকে আলোচনায় আছেন- দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার শাহাজাদা, কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল হাসান, আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক হোসাইন সাদ্দাম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপ-সম্পাদক আল মামুন ও সহ-সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম ঐতিহ্য, ঢাবির মুহসীন হলের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী।

ফরিদপুর অঞ্চল থেকে আলোচনায় আছেন- সহ-সভাপতি আরেফিন সিদ্দিক সুজন, শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসাইন, সমাজসেবা সম্পাদক রানা হামিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি বিদ্যুৎ শাহরিয়ার কবির ও স্যার এ এফ রহমান হলের সভাপতি হাফিজুর রহমান।

গুরুত্বপূর্ণ এই চারটি অঞ্চলের বাইরে সিলেট অঞ্চল থেকে নেতৃত্বে আসতে পারে- কেন্দ্রীয় গণশিক্ষা সম্পাদক আনিসুল ইসলাম জুয়েল, ঢাবির মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের সভাপতি ইউসুফ উদ্দিন খান, দপ্তর বিষয়ক উপ সম্পাদক এন এ চৌধুরী শাওন।

ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে আলোচনায় রয়েছেন- পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এ বি এম হাবিবুল্লাহ বিপ্লব, জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস, সলিমুল্লাহ মুসলিম (এস এম) হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস।

খুলনা অঞ্চল থেকে আলোচনায় আছেন- গ্রন্থনা ও প্রকাশনা বিষয়ক উপ-সম্পাদক সাগর হোসেন সোহাগ। এছাড়া ইউনিট পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ আহমেদ খান শীর্ষ পদপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় আছেন।

এর বাইরে নারী নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনায় আছেন- সহসভাপতি চৈতালী হালদার চৈতি, কবি সুফিয়া হল ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় অর্থ বিষয়ক উপ-সম্পাদক তিলোত্তমা শিকদার, আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-সম্পাদক ইশাত কাসফিয়া ইরা, পরিবেশ বিষয়ক উপ-সম্পাদক শেখ মারুফা নাবিলা ও সহসম্পাদক শিরীন শিলা।

নেতৃত্বে কারা আসছেন, এসব বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। একজন নেতা বলেন, সম্মেলনের আগে এ নিয়ে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ নেই। সংগঠনের কাউন্সিলর এবং অভিভাবক হিসেবে শেখ হাসিনার পছন্দই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হবে।