সামান্য ব্যয় বহন করেই বাস মালিকেরা নিশ্চুপ 

রাজধানী ঢাকার কাওরান বাজারে দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারানোর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেনের চিকিৎসার জন্য ২০ হাজার করে ৪০ হাজার টাকা দিয়েই দায় শেষ করেছে স্বজন পরিবহন ও বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ। ওই টাকা দেওয়ার পর দুই বাসের মালিকদের পক্ষ থেকে আর কোনও যোগাযোগ রাখা হয়নি বলে রাজীবের পরিবারের অভিযোগ। অথচ রাজীবের চিকিৎসার পুরো ব্যয় দ্বিতল বাসের মালিক বিআরটিসি (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন) এবং স্বজন পরিবহনের মালিককে বহন করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

গতকাল বুধবার ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাজীবের বড়খালা জাহানারা বেগম বলেন, ‘রাজীবের চিকিৎসায় আমাদের অনেক টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু কোর্ট থেকে রায় দেওয়ার পর বিআরটিসি এবং স্বজন পরিবহনের পক্ষ থেকে আমাদের মাত্র ২০ হাজার করে ৪০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এর চেয়েও অনেক বেশি টাকা শুধু শমরিতা হাসপাতালেই খরচ হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ আরও ২০ হাজার টাকা দিয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা ৬০ হাজার টাকার মতো পেয়েছি। এর বাইরে আর কোনও টাকা আমরা পাইনি। রাজীবের চিকিৎসায় আমাদের আরও কয়েকগুণ বেশি টাকা খরচ হয়েছে।’

গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর কাওরান বাজারে দুই বাসের মাঝে আটকা পড়ে হাত হারানোর পর রাজীবকে রাজধানীর পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক রাতেই তার চিকিৎসা খরচ দাঁড়ায় ৬০ হাজার টাকা। জাহানারা বেগম জানান, তাদের পক্ষে এত টাকা বহন করা সম্ভব না হওয়ায় সেখান থেকে রাজীবকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের দেওয়া ৪০ হাজার টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ রাজীবের চিকিৎসার ব্যয় বহন করে। প্রথমে মেডিক্যালের বাইরে থেকে কেনা ওষুধ নিজেদের খরচে কিনে টাকার রশিদ রাখতে বলা হলেও পরে পরিচালকের নির্দেশে সেই খরচ বহন করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ।’ সর্বমোট চিকিৎসা বাবদ মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা জানান তিনি।

জাহানারা বেগম আরও জানান, গত ১৭ এপ্রিল রাত ১২টা ৪০ মিনিটে রাজীব মারা যাওয়ার পর তার লাশ ফ্রিজিং অ্যাম্ব্যুলেন্সে করে গ্রামের বাড়িতে নিতে প্রায় ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। সেই টাকাও তাদের বহন করতে হয়েছে। ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার পর এ পর্যন্ত বিআরটিসি বা স্বজল পরিবহনের কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। শৈশবে মা-বাবা হারা রাজীবের লালন-পালনকারী এই নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোটি টাকা দিলেও আমরা তো আর রাজীবকে ফিরে পাবো না। আমরা চাই, যে চালকদের কারণে আমরা রাজীবকে হারিয়েছি সেই চালকেরা যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। ভবিষ্যতে যাতে কেউ সড়কে এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতা না করে, শিশু-নারী-পুরুষ সবাই যাতে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে, সড়ক যাতে নিরাপদ হয়। প্রধানমন্ত্রী যেন এই ব্যবস্থা নেন।’

রাজীবের হাত হারানোর পরদিন ৪ এপ্রিল এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ তার চিকিৎসার খরচ বহন করতে দুই বাস মালিককে নির্দেশ দেন। এছাড়া রাজীবের কৃত্রিম হাত প্রতিস্থাপন করা হলে সেই খরচও দুই বাস মালিককে বহন করার আদেশ দেন আদালত। একইসঙ্গে রাজীবকে ক্ষতিপূরণ বাবদ এক কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত। পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে কার্যকর করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আইন সংশোধন ও নতুন করে বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিসি’র সচিব নুর-ই-আলম বলেন, ‘বিষয়টি পুরোপুরি দেখভাল করার জন্য আমাদের জোয়ারসাহারা বাস ডিপো ম্যানেজার মুনিরুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি রাজীবের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। প্রাথমিকভাবে আমরা তার পরিবারকে চিকিৎসার জন্য ২০ হাজার টাকা দিয়েছি। যেহেতু এই টাকা পরিশোধে একটা প্রক্রিয়া আছে, অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত যা হবে, আমরা সে অনুযায়ী পুরো টাকাই রাজীবের পরিবারকে দেবো।’ তিনি বলেন, ‘আসলে এই ঘটনায় দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও মর্মাহত। আমরা চাই না আর কেউ এমন ঘটনার শিকার হোক। তার (রাজীব) ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সেই বাসের চালককে বরখাস্ত করেছি।’

এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘কোর্টের আদেশের পরেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহত একটা মানুষের চিকিৎসায় মাত্র ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার মানে হচ্ছে, রাষ্ট্রের সঙ্গে তামাশা করা।’ তিনি বলেন, ‘তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনিরের দুর্ঘটনাসহ আরও দুটি ঘটনার মামলায় আদালত প্রায় তিন কোটি টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। একটা মানুষ জীবনে যে পরিমাণ আয় করার কথা সেটা ক্ষতিপূরণ হিসেবে তার পাওয়ার কথা। উন্নত বিশ্বেও এভাবেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।’

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মনে করি, বাংলাদেশ এখন উন্নত বিশ্বের কাতারে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনায় উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া জরুরি। যদি তা না হয় উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যেতে আমাদের আরও বিলম্ব হবে। আমরা আশা করবো সরকার এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেবে।’ এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহকে একাধিক বার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি। স্বজন পরিবহনের কোনও কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।