কুড়িগ্রামে রেলওয়ের জমি যাচ্ছে ভূমিদস্যুদের দখলে

কুড়িগ্রামে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় পুরাতন রেলওয়ে স্টেশন পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা। ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টেশনে কুড়িগ্রাম শহর উন্নয়নে যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল তা আর সাফল্যের মুখ দেখছে না। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৮৫৩ সালে ভারত উপমহাদেশে রেল যোগাযোগ শুরু হলে এর কয়েক বছর পর ব্রিটিশ সরকার কুড়িগ্রামে যোগাযোগের জন্য রেলপথ নির্মান করে। তৎকালীন কুড়িগ্রাম মহকুমা শহরের সাথে যোগাযোগের জন্য কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর এলাকায় রেলবাজারে কুড়িগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন স্থাপন করা হয়। ধরলার অব্যাহত ভাঙনে স্টেশনটি নদীগর্ভে বিলীন হলে ১৯২৬ সালের দিকে বর্তমান পুরাতন শহরে ১২ একর ৪২ শতক জায়গার ওপর স্টেশনটি পুনঃস্থাপন করা হয়।

যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্টেশনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে। ১৯৬৭-৬৮ সালে কুড়িগ্রাম সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের কালে মৌজায় জনগণের সুবিধার্থে কুড়িগ্রামে আরও একটি রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হয়। নুতন রেল স্টেশনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে পুরাতন রেল স্টেশনটির গুরুত্ব কিছুটা কমতে থাকে। ১৯৭৯ সালে বিএনপি সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী মাঈদুল ইসলাম কুড়িগ্রাম শহরকে যানজটমুক্ত করার লক্ষ্যে পুরাতন স্টেশনটি তুলে দেয়ার জন্য পদক্ষেপ নেন। কিন্তু জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে তা সম্ভব হয়নি। এদিকে সড়ক যোগাযোগ উন্নত হতে থাকলে স্টেশনটির গুরুত্ব আরো কমতে থাকে।

তাছাড়া রেল কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যস্থাপনার কারণে পুরাতন স্টেশনটি একেবারে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। শহরের মাঝ দিয়ে রেলপথ থাকায় রেল চলাচলের সময় যানজট প্রায় লেগে থাকতো। কোনো কোনো সময় রেলের ইঞ্জিন-বগি লাইনচ্যুত হলে কুড়িগ্রাম শহরের মানুষের বিড়ম্বনার শেষ ছিল না। এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তির জন্য পুরাতন শহরের লোকজন রেলস্টেশনটি তুলে দেয়ার দাবিতে সোচ্চার হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে চলে নানারকম সংগ্রাম। স্টেশন তুলে ওই স্থানে বাসটার্মিনাল, মার্কেট, ভূরুঙ্গামারী কুড়িগ্রাম বাইপাস সড়ক, শিশু পার্কসহ নানান স্থাপনার দাবিতে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক করা হয় তৎকালীন কুড়িগ্রাম পৌরসভার মেয়র আবু বকর সিদ্দিককে।

সাবেক মেয়র আবু বকর সিদ্দিক জানান, তৎকালীন যোগাযোগ উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ৩০ জুন ২০০৬ সালে মন্ত্রণালয় পুরাতন রেল স্টেশনটি সরকারিভাবে কার্যক্রম বন্ধ করে দেন।

এরপর সাবেক মেয়র আবু বকর সিদ্দিক পুরাতন স্টেশনটি পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের জন্য আবেদন করেন এবং ধরলা বাইপাস সড়ক, বাস/ট্রাক স্টান্ড, মার্কেট, শিশুপার্ক নির্মাণের জন্য ইউজিআইআইটি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে ঢাকায় পাঠানো হয়। এখন কি অবস্থায় রয়েছে তিনি তা জানেন না।

এরপর সেনা সমর্থিত সরকার দেশ পরিচালনায় আসলে স্টেশন এলাকা অক্ষত অবস্থায় থাকে। ২০০৮ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে ভূমিদস্যুরা নড়েচড়ে বসে। গত কয়েক বছরে ভূমিদস্যুরা পুরো স্টেশন এলাকা দখল করে নেয়। দখলের তালিকায় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপির কতিপয় নেতাকর্মীসহ স্থানীয় লোকজনের নাম চলে আসে। বর্তমানে স্টেশনটি দেখভাল করার মতো কেউই নেই। প্রতিনিয়ত স্টেশনের টিন, লোহার খুঁটি, শাল কাঠের খুঁটি এমনকি প্লাটফরমের ইট চুরি হচ্ছে। নিজের জায়গা মনে করে ভূমিদস্যুরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাড়িঘর নির্মাণ করছে। অনেকে জায়গা দখল করে কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিচ্ছে। দখলবাজরা শক্তিশালী হওয়ার কারণে কর্তৃপক্ষের জায়গা উদ্ধারে তেমন তৎপড়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

কুড়িগ্রাম-২ সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. জাফর আলী জানান, বিএনপি সরকার কুড়িগ্রাম পুরাতন স্টেশনটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তাদের উচিত ছিল শহর উন্নয়নে পরিকল্পনামাফিক কাজ করা। কুড়িগ্রাম শহর উন্নয়নে পুরাতন স্টেশনটি যাতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় সেদিকে সরকারের লক্ষ্য রয়েছে।

লালমনিরহাট রেলওয়ে ডিভিশনের ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার আসাদুল হক জানান, যেহেতু কুড়িগ্রাম পুরাতন রেল স্টেশনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সে কারণে রেলের সকল সম্পত্তি অকশন দেয়া হবে। এ সংক্রান্ত পত্র ইতোমধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে।

মোঃ মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি