‘এটা কোন কোটা নয়, চরম বৈষম্য’

রবিবার বেলা ২টা। ছোট ছোট দলে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন শাহবাগের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে। কিছুৃক্ষণের মধ্যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী জড়ো হলেন সেখানে। প্রত্যেকের হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে মুখে স্লোগান এবং প্রতিবাদের ভাষায় মুখরিত শাহবাগ। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকাসহ সারাদেশে ‘কোটা নয়, ইহা বৈষম্য, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, কোটার কোন ঠাঁই নাই’ স্লোগানে রাজপথে হাজারো শিক্ষার্থী গণপদযাত্রা পালন করছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ৫৫ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের অগ্রাধিকার কোটা রয়েছে। আর বাকি ৪৫ শতাংশ নিয়োগ হয় মেধা কোটায়। এ কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা।

রোববার বেলা ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে পদযাত্রাটি শুরু হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনের রাস্তা দিয়ে বের হয়ে রাজু স্মৃতি ভাস্কর্য হয়ে নীলক্ষেত ও কাঁটাবন ঘুরে শাহবাগের মোড়ে এসে অবস্থান নেন তাঁরা। এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন হাজারো শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী। তাঁদের দাবি, বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সংস্কার করে কমাতে হবে। এই চাকরিতে কোটা সব মিলিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।

ভীড়ের মাঝখান থেকে শোনা স্লোগানে কোটা বৈষম্যের তীব্র প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় কোটার কোন ঠাঁই নাই’। ‘এটা কোন কোটা নয়, চরম বৈষম্য।’ শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্যে আন্দোলন করে আসছে। কন্তিু এত আন্দোলনেও কোটা সংস্কারে কোন কার্যকর উদ্যোগ নাই সরকারের।পাকিস্থান আমলে ঠিক ৫৬ শতাংশ কোটা ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়তো বাঙালীরা। সবরকম যোগ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও বঞ্চিত হতো বাঙ্গালীরা।

সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী কোটা এবং ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটাসহ মোট ৫৬ ভাগই কোটাধারীদের জন্যে বরাদ্দ। মোট জনসংখ্যার তুলনায় কোটাধারী জনসংখ্যা অনেকটা হাতেগোনার মত হলেও এই সুবিধা তারা পান। ১ দশমিক ১০ শতাংশ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ, ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ১ শতাংশ, ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা পোষ্যদের জন্য ৩০ শতাংশ এবং নারীদের জন্য ১০ শতাংশ কোটার কারণে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এছাড়াও জেলা কোটায় ১০ শতাংশ নিয়োগ এ অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়ি দেয়। হতাশার রাজ্যে নিমিজ্জিত এই তারুণ্যকে নিয়ে ভাববার সমযয় করো না থাকায় বার বারই তরুণরা রাজপথে নামেন। আজ মেধা আর কোটা বৈষম্য বাড়তে বাড়েতে ৫৬ শতাংশ কোটা মেধাকে পেছনে ফেলছে বিদ্যুতের গতিতে। এর লাগাম টেনে ধরার জন্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহব্বান জানান শিক্ষার্থীরা।

কোটা নিয়ে চট্টগ্রামের পটিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তব্য হলো এমন, “কোটা ব্যবস্থা রাখতেই হবে, কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তাদের (মুক্তিযোদ্ধা) আমাদের সম্মান দিতেই হবে। তাদের ছেলে, মেয়ে, নাতি, পুতি পর্যন্ত যেন চাকরি পায়, তার জন্য কোটার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আর যদি কোটায় না পায়, তাহলে ইউনিভার্সিটির যারা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী তাদের দেয়া যাবে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আমাদের এ বিশেষ ব্যবস্থা করতেই হবে। আমাদের দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। তাদের বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করেছি। এ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এ কথা ভুললে চলবে না।”

কোটা ব্যবস্থার ব্যাপক ফারাক থাকার কারণে মেধাবীরা সবদিকেই পিছিয়ে পড়ছে। তবে আলোচনার মুখে সারাদেশে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষকদের পদ  ৩৭তম বিসিএস থেকে পূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ জন্য এই কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে।