আসলে কয়টি গম্বুজ রয়েছে ‘ষাটগম্বুজ’ মসজিদে?

‘ষাটগম্বুজ’ মসজিদ অতুলনীয় নকশার এক মসজিদ। ছাদহীন এই মসজিদের অর্ধডিম্বাকার ও আয়তাকার গম্বুজগুলোই ‘ষাটগম্বুজ’ মসজিদের ছাদ। এ জন্যই একে ‘ছাদগম্বুজ’ মসজিদ বলে। ‘ষাটগম্বুজ’ থাকার কারণে এর নামাকরণ করা হয়েছে ‘ষাটগম্বুজ’ মসজিদ। কিন্তু আসলে এই মসজিদে গম্বুজ আছে ৬০ টির অনেক বেশি। নাম ‘ষাটগম্বুজ’ হলেও মসজিদটিতে মোট গম্বুজ আছে ৮১টি।

ষাটগম্বুজ মসজিদের বর্তমান ইমাম মো. হেলাল উদ্দিন ও কয়েকজন ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতি থেকে জানা যায়, বাগেরহাট শহর থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের উত্তর পাশে সুন্দরঘোনা গ্রামে ষাটগম্বুজ মসজিদের অবস্থান। সুলতানি আমলের অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদ বাগেরহাট শহরের অন্যতম আকর্ষণ। ষাটগম্বুজ ছাড়াও অসংখ্য মসজিদ, দিঘি ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন হজরত খানজাহান (রহ.)।

ঐতিহাসিকদের ধারণা, বিলুপ্তপ্রায় প্রাচীন খলিফাতাবাদ নগরই আজকের বাগেরহাট। বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন হারিয়ে যাওয়া বিশ্বের যে ১৫টি শহরের তালিকা করেছে, তাতে রয়েছে এই শহরের নাম। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকো ১৯৮৫ সালে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর (Historic mosque city of Bagerhat) হিসেবে ষাটগম্বুজ মসজিদসহ খানজাহানের স্থাপত্যগুলোকে তালিকাভুক্ত করে।

ঐতিহাসিকদের অনেকে মনে করেন, এই ৬০টি খাম্বাজের কারণে মসজিদটির নাম হয় ‘ষাটখাম্বাজ’। আর খাম্বাজ শব্দটি বিবর্তিত হয়ে ‘ষাটগম্বুজ’ নামটি এসেছে। আবার সাতটি গম্বুজের সারি থেকে ‘সাতগম্বুজ’ এবং তা কালের বিবর্তনে ‘ষাটগম্বুজ’ হয়েছে বলেও মনে করেন কেউ কেউ।

মসজিদে সাত সারির ২১টি কাতারে একসঙ্গে প্রায় তিন হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। নারীদের নামাজের জন্য রয়েছে আলাদা স্থান। এই তথ্যই মসজিদটির বিশালতা প্রমাণ করে। অথচ এত বড় মসজিদে আলো-বাতাসের কোনো অভাব নেই; অনন্য নকশার কারণে কৃত্রিম আলো-বাতাসের দরকার পড়ে না বললেই চলে।

দৈর্ঘ্যে ১৬৮ ফুট ও প্রস্থে ১০৮ ফুটের এই মসজিদের দেয়ালগুলো পুরু ৮ ফুট করে। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে ছয়টি করে ছোট ও একটি করে বড় খিলান। পূর্ব পাশে একটি বড় ও তার দুই পাশে পাঁচটি করে ছোট খিলান। ষাটগম্বুজ মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলারই পাথরের তৈরি। পুরো মসজিদ তৈরির মূল উপাদান চুন, সুরকি, কালো পাথর ও ছোট ইট। এই মসজিদের স্থাপত্যকলার সঙ্গে মধ্য এশিয়ার তুঘলক (তুরস্ক) স্থাপত্যশৈলীর বিশেষ মিল রয়েছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বাগেরহাট জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান ও গবেষক গোলাম ফেরদৌস বলেন, খানজাহান (রহ.) কবে ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, তার সঠিক কোনো সন-তারিখ উল্লেখ নেই। তবে এই পুরাকীর্তিটি সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর সাক্ষ্য বহন করে।

ষাটগম্বুজ ছাড়াও খলিফাতাবাদ শহরের টিকে থাকা অন্য স্থাপত্যগুলোর কোনোটিতেই কোনো নামফলক নেই। শুধু খানজাহান (রহ.)-এর মাজারে একটি শিলালিপিতে মৃত্যুর তারিখসহ তাঁর নাম লেখা আছে। বলা হয়ে থাকে, শিলালিপিটি খানজাহান (রহ.) নিজেই তাঁর জীবদ্দশায় তৈরি করিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর সহযোগী পীরালী তাহের এটি স্থাপন করেন।

ওই শিলালিপিতে নাম লেখা আছে ‘খান-উল-আজম উলুঘ খান-ই-জাহান’। ‘খান-উল-আজম’ হচ্ছে শাসকের দেওয়া উপাধি। ধারণা করা হয়, দিল্লির তৎকালীন শাসক ফিরোজ শাহ্ তুঘলক সেনাবাহিনীতে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য খানজাহান (রহ.)-কে ওই উপাধি দিয়েছিলেন। খান-ই-জাহানও তাঁর উপাধি। চিশতিয়া তরিকার অনুসারী হিসেবে তিনি ওই উপাধি নেন। তাঁর প্রকৃত নাম আসলে ‘উলুঘ খান’। আর শিলালিপির কোথাও খানজাহান (রহ.)-এর নামের সঙ্গে ‘আলী’ যুক্ত নেই। লোকমুখে নামটি খানজাহান আলী (রহ.) হয়ে গেছে বলে মনে করেন গবেষকেরা।

ছয়শত বছরের পুরোনো ষাটগম্বুজ মসজিদসহ খলিফাতাবাদ নগরের পুরাকীর্তিগুলো ১৯০৪ সালে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার। এরপর ১৯১৩ সালে ষাটগম্বুজ মসজিদকে ‘ক্যালকাটা গেজেট’ভুক্ত করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রথম সংস্কারকাজ হয় ১৯২৩ সালে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে দক্ষিণ এশীয় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ষাটগম্বুজ মসজিদটির সংস্কারকাজ হয়েছে।