মাতৃভূমির মমত্বে গড়া অভয়নগরের “ভূমি অফিস” ও “স্বাধীনতা অঙ্গন”

আমি থাকবোনা তবে রয়ে যাবে মাতৃভূমির মমত্বে গড়া অভয়নগরের “ভূমি অফিস” ও “স্বাধীনতা অঙ্গন”

একটা উপজেলায় ভূমি অফিসে কি থাকে? যারা একবার হলেও গেছেন, তারা এক কথায় বলতে পারেন মাতৃভূমির প্রতি টান ছাড়া যে কোন কিছু। আর যদি কোনো ভূমি অফিস সরব হয় মাতৃভূমির প্রতি মমত্ব আর স্বাধীনতার চেতনায়?

এমন আবার হয় না কি? দেশের অন্তত: একটি ভূমি অফিস মাথা উঁচু করে প্রশ্নের উত্তরে বলবে “হ্যাঁ”। যশোরের অভয়নগরের উপজেলা ভূমি অফিস।

কি এমন আছে এই ভূমি অফিসে যা মাতৃভূমিকে ভালবাসতে শেখাবে? স্বাধীনতার চেতনায় জাগ্রত করবে মনকে?
-“স্বাধীনতা অঙ্গন”

দেশের প্রথম ভূমি অফিস প্রাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক থিম পার্ক। গত বছরের মার্চে এসি ল্যান্ড হিসেবে যোগদান করতে গিয়ে প্রথম দিনই হোঁচট খাই কিছুটা। প্রাঙ্গণটা ঝোঁপ-ঝাড় আগাছা আর অভিযানে জব্দ করা ভেজাল সারের বস্তায় ভর্তি।
মন ভাঙ্গেনি। মন গড়েছিলাম “কিছু একটা” গড়ার প্রত্যয়ে। ভূমি অফিসের কাজের ব্যস্ততায় কিছু করাই নাকি কঠিন হবে- পিছুটান কয়েকজন স্টাফের।

তবে, বাকি কয়েকজন একটা প্রস্তাব দেন “বাগান করেন, স্যার। মন বাঁধ সাধে। বোবা প্রাঙ্গনটাকে চেয়েছিলাম সরব করতে। এমন কিছু করতে যাতে আঙ্গিনাটা কথা বলে, কিছু শেখায়। তিন-চারদিন অফিস করার পর আরেকটা বিষয় নজরে এলো। ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষগুলো হয় বৃদ্ধ না হয় মাঝবয়েসি। তরুণ প্রজন্ম এখানে হিসেবের খাতা থেকে এককথায় বাদই বলা যায়।

স্বপ্ন এখন দ্বিগুণ। বোবা প্রাঙ্গনকে ভাষা দেয়া আর তরুণ প্রজন্মকে তাদের মতো করে ভূমি অফিস চেনানো। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আর মাতৃভূমির মমত্বে উদ্ধুদ্ধ করা। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাই নি। উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ আর একজন ভাস্কর নিয়ে নেমে পড়ি কর্মযজ্ঞে।

প্রথম তিনদিন লেগে যায় শুধু জঙ্গল আর আবর্জনা পরিষ্কারেই। এলাকার সবাই এগিয়ে এসে যার যার জায়গা থেকে সহযোগিতা করতে থাকে। তাদের কথা একটাই “এটা তো আমাদেরই থাকবে”। টানা ১৫ দিন পরিশ্রম করে যশোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ছবি সংগ্রহ করি হার্ড আর সফট কপিতে। প্রায় অর্ধশত। সব ছবিগুলোর বড় আকারের প্রিন্টেড কপি সেঁটে দেয়া হয় জীর্ন দেয়ালের গাঁয়ে। নতুন এ দেয়ালিকাই প্রাঙ্গনকে সরব করে সবার আগে। মনিহারের পাশে গণহত্যা থেকে সম্মুখযুদ্ধ এমনকি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যশোর সফরকালের ছবিও ফুটে ওঠে “দেয়াল ৭১” এ।

এবার দেয়ালকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয় ইটের রাস্তা। “রোড টু ফ্রিডম”, শুধু মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে মন ভরছিলো না। ভাস্কর অনন্ত হ্যাপিকে নতুন কর্মযজ্ঞে নামালাম। তিন দিনের মধ্যে তৈরি হলো গণহত্যার স্মৃতি ভাস্কর্য ” স্মৃতিতে ৭১”
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরগুলো জানাতে তৈরি হলো কংক্রিটের মানচিত্র।

আমাদের মুক্তির পথে যাত্রাটা পাহাড়ে আরোহণের মত কঠিন পথ ছাড়া আর কি! সে পথের প্রতিটা ঘটনা বোঝাতে গড়ে তুলেছি ” পর্বত চেতনা”। যার প্রতিটি খাঁজে লেখা আছে ৫২ থেকে ৭১ এর ঘটনাগুলো।

ইদানিং ফেসবুক, ইউটিউবে ভিডিও দেখি ভিডিও ভাইরাল: জাতীয় দিবসগুলো জানে না জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা! সেই কষ্ট থেকেই বানিয়েছি “দিবস বাতায়ন”

স্বাধীনতা অঙ্গনের ঢোকার মুখে দিবস বাতায়নের একটি বোর্ড। দিবসের নাম লেখা। কিন্তু উত্তর নেই। উত্তর মিলবে এর জমজ ভাইয়ের কাছ থেকে: বের হওয়ার সময়, আরেক বোর্ডে।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ শাহাদাত বরণ করেন যশোরে। মৃত্যুর মাধ্যমে যে সম্পর্ক তা ফুটিয়ে তুলতে তৈরি করেছি “বীরের দুয়ার”। আছে নুর মোহাম্মদ শেখের ম্যুরাল আর বীরের জীবন কথা।

অঙ্গনটি স্বাধীনতার আর ২৬ মার্চকে ভুলে গেলাম? ভুলে যাই নি। ফোয়ারা ও ভাস্কর্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে “সরোবর ২৬” পাশের বোর্ডেই মিলবে ২৬ মার্চের তাৎপর্য।

স্বাধীনতা অঙ্গনের গর্ভেই গড়ে তুলেছি আরেক অনন্য সৃষ্টি। দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মুক্ত আকাশ পাঠাগার ” মুক্তপাতা” সেখানে খোলা আকাশের নিচেই হবে পাঠকের বই পড়া। বইগুলো লেমিনেটিং করা। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে ওভাবেই থাকে বইগুলো। বাংলাদেশে তো প্রথম আর বিশ্বে এমন উদাহরণ দ্বিতীয়।

বের হওয়ার পথটাতে উদ্ধৃতি চিহ্ন বা কোটেশন মার্কের মতো বসার যায়গা। নাম দিয়েছি “শূণ্য পয়েন্ট”। কারণটা সহজ। মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের নিভে যাওয়ায় শোকে আমাদের উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে বক্তব্য শূণ্য। অর্থাৎ নীরবতা।
এই অঙ্গনেই গড়ে তোলা হয়েছে পাখিদের অভয়ারণ্য “বিজয় বিহঙ্গ”।

আমার অঙ্গনটা আজ কথা বলতে শিখেছে। গাইছে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ আর মাতৃভূমির গান। তরুণ প্রজন্ম শয়ে-শয়ে আসে স্কুল ছুটির পর। অভয়নগরের স্কুলগুলোর একটি করে ক্লাস হয় স্বাধীনতা অঙ্গনে। ওরা আসে,ওরা শেখে, সেই সাথে চেনে ভূমি অফিসকে।

আমি থাকবো না। রয়ে যাবে মোর এক টুকরো স্বাধীনতার স্বাদ আর মাতৃভূমির মমত্বে গড়া অভয়নগরের ভূমি অফিস আর “স্বাধীনতা অঙ্গন”। চিৎকার করে বলতে চায় মন:
“লাল-সবুজে, বুঝ-অবুঝে এই তো প্রাণের বাংলাদেশ।।”

লেখক: মনদীপ ঘরাই
সিনিয়র সহকারী সচিব
ও প্রাক্তন এসি ল্যান্ড, অভয়নগর,যশোর

অনুলেখন-
হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি