দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশেরই কারন নিয়ন্ত্রণহীন গতি

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বাড়ছেই। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব বলছে, ২০১৭ সালে আগের বছরের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ২২ শতাংশ বেড়েছে। আর সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশেরই কারণ হলো চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতি।

গতকাল সোমবার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের টিপুরদী এলাকায় যে সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ জনের প্রাণ গেল, এর পেছনে চালকের সেই বেপরোয়া মনোভাব ও গতি দায়ী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি প্রথমে একটি রিকশাকে ধাক্কা দেয়। এ সময় চালক দ্রুত পালাতে গেলে বাসটি কনটেইনারবাহী ট্রেইলরকে পেছনে আঘাত করে।

বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) দুর্ঘটনার কারণ-সংক্রান্ত পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে থাকে। ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ করে এআরআই বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। আর পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ। তাদের গবেষণা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশই ঘটছে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে।

জানতে চাইলে এআরআইর পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, চালকের লাইসেন্স পাওয়ার পদ্ধতি খুবই দুর্বল এবং তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। ক্ষতিপূরণ দেওয়া বা পাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ইনস্যুরেন্স করার নামে কতগুলো টাকা নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা পাচ্ছে না। আর আইনের প্রয়োগ সড়কে চোখে পড়ে না। এ জন্যই চালকেরা বেপরোয়া হচ্ছেন। এর বলি হচ্ছে মানুষ, যা দেশের অর্থনীতিকেও পেছনে ঠেলছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দেশে যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ। এর মধ্যে চালকের লাইসেন্স আছে ১৮ লাখ। অর্থাৎ বাকি ১৫ লাখ যানবাহন চলছে লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে। এ ছাড়া পেশাদার চালকদের মধ্যে অন্তত ২ লাখ চালক লাইসেন্স পেয়েছেন শ্রমিক সংগঠনের চাহিদা মেনে, যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির পরিমাণও অপ্রতুল।

সাম্প্রতিক সময়ে একমাত্র চলচ্চিত্রব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরের গাড়িকে চাপা দেওয়া চালকের যাবজ্জীবন সাজার রায় হয়েছে বিচারিক আদালতে। সরকার ২০১০ সালে সড়ক পরিবহন আইন যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়। গত বছর মন্ত্রিসভায় তা নীতিগত অনুমোদনও হয়। তবে এখনো এটি আইনে পরিণত হয়নি। আর সরকার গত বছর মহাসড়কে রিকশা, অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধ করে। কিন্তু সব মহাসড়কেই এ ধরনের ছোট যানবাহন চলতে দেখা যায়। গতকালও দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি প্রথমে একটি রিকশাকে ধাক্কা দিয়েছিল।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য তাঁরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে থাকেন। তবে তা অপ্রতুল। সরকারের সব সংস্থা একযোগে কাজ করলে একটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এই চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া চালকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, গতকালের দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য বিআরটিএ তদন্ত কমিটি করেছে। প্রতিবেদন পেলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এতে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৯ জনের প্রাণ যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০১৭ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ হাজার ৩৯৭ জন। অর্থাৎ দিনে ২০ জন। সংগঠনটির হিসাবে ২০১৬ সালের তুলনায় গত বছর ২২ দশমিক ২০ শতাংশ প্রাণহানি বেড়েছে। এর বাইরে নিরাপদ সড়ক চাই—নিসচার হিসাবে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫ হাজার ৬৪৫ জন। দিনে ১৫ জন। তাদের হিসাবে, ২০১৬ সালের চেয়ে প্রায় দেড় হাজার প্রাণহানি বেড়েছে।

সরকারি হিসাব রাখে বাংলাদেশ পুলিশ। সংস্থাটি গত বছরের হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি। তবে আগের কয়েক বছরের হিসাব বলছে, বছরে দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা দুই থেকে আড়াই হাজারের মধ্যে।

জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনা কমানোর কার্যকর কোনো চেষ্টা আছে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে, সড়কে দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। পুলিশ মাঝেমধ্যে গাড়ি থামিয়ে শুধু মাদক আছে কি না তা দেখে। এর বাইরে সড়কে বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা নেই। এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি দুটিই বাড়ছে।